গিট্টু, বাঘা, বাউল, পারুলদের সঙ্গে মুস্তাফা মনোয়ার স্মরণ
- সুর, নৃত্য ও স্মৃতিচারণ

স্মরণানুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানের সমবেত পরিবেশনার মাধ্যমে
সেগুনবাগিচার জাতীয় নাট্যশালার লবিতে প্রবেশ করতেই দেখা হলো পাপেট চরিত্র গিট্টু, বাঘা, বাউল, পারুলদের সঙ্গে। তারা সবাই পাপেট চরিত্র হিসেবে অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে আছেন। এই চরিত্রগুলোর স্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ারের স্মরণানুষ্ঠানের অংশ হয়েছিল এই পাপেট চরিত্রগুলো।
আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় সুর, নৃত্য, আবৃত্তি ও স্মৃতিকথনের মধ্যদিয়ে স্মরণ করা হয় কিংবদন্তি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে। জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ‘শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার স্মরণ পর্ষদ’ এই আয়োজন সাজায়। নাট্যশালার লবিতে রাখা হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারের পাপেট চরিত্রদের, একই সাথে তার আঁকা চিত্রকর্মের প্রদর্শনীও হয়।
মিলনায়তনে স্মরণানুষ্ঠানের সূচনা হয় ‘ও আমার দেশের মাটি’ গানের সমবেত পরিবেশনার মাধ্যমে এবং তুলে ধরা হয় মুস্তাফা মনোয়ারের সংক্ষিপ্ত জীবনালেখ্য।
স্বাগত কথনে সাংস্কৃতিক সংগঠক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ বলেন, ‘আপনারা সবাই জানেন, মুস্তাফা মনোয়ার গত ২৯ জুন মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু আমি মনে করি তার মতো মানুষের মৃত্যু নেই। তিনি আমার সরাসরি শিক্ষক নন। কিন্তু তার কাছে থেকে আমি শিখেছি। এখনও শিখি-শিখব। তিনি তার কাজের মাধ্যমে আমার মতো হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন। ভবিষ্যতেও অনুপ্রাণিত করবেন।’
মুক্তিযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ারের ভূমিকা স্মরণ করে নাসির উদ্দীন ইউসুফ আরও বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে মুস্তাফা মনোয়ার বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাপেট শো দেখাতেন। মৃত্যু পথযাত্রী ও চরম বিপর্যয়ের মুখে থাকা মানুষদের মনে আশার আলো জাগাতে এবং শক্তি জোগাতে তিনি এই কাজ করেছিলেন। সীমান্ত এলাকায় বা শরণার্থী শিবিরে তখন বিদ্যুৎ ছিল না। রান্নার জন্য ব্যবহৃত কাঠের আগুনের আলো ব্যবহার করে মুস্তফা মনোয়ার তার পাপেট শো প্রদর্শন করতেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা দেখে আতঙ্কিত হওয়া শিশুদের মনে এই পাপেট শো দারুণ প্রভাব ফেলেছিল। কারণ, পাপেটের মাধ্যমে মুস্তফা মনোয়ার শিশুদের দেখিয়েছিলেন পাকিস্তানিরা কতটা ভীত, যা শিশুদের আনন্দ ও সাহস জুগিয়েছিল।’
পরে শ্রদ্ধাঞ্জলি পাঠ করেন অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম। এ সময় সেলিম বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন ডিরেক্টরস গিল্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। আমি এই সংগঠনের বর্তমান সভাপতি হিসেবে সকল নির্মাতার পক্ষ থেকে তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’ পরে তিনি শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের স্ত্রী মেরি মনোয়ারের হাতে শ্রদ্ধাঞ্জলিপত্র তুলে দেন।
মেরি মনোয়ার বলেন, ‘আজ আমার ৬১ বছরের সঙ্গী মোস্তফা মনোয়ারের স্মরণে আমরা সবাই সমবেত হয়েছি। তাকে যে দেশের লোক এত ভালোবাসে, এটা ভাবা যায় না। আগে দেখতাম উনাকে নিয়ে কোথাও বাইরে গেলে হাঁটা যেত না। কোথা থেকে যেন সবাই এসে ঘিরে ধরত। আর তার সঙ্গে ছবি তুলতো।’
অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’ গানের সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্যাঞ্চলের শিল্পীরা। পরে নৃত্যশিল্পী শামীম আরা নিপা বলেন, ‘মুস্তাফা মনোয়ার আকাশের মতো, যার কোন ক্ষয় নাই। যাকে ধরা যায় না; ছোঁয়া যায় না, কেবল অনুভব করা যায়। ৮০ দশকের শুরু থেকে তার সঙ্গে কাজ করেছি।’
রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শ্রদ্ধা জানান শিল্পী লাইসা আহমদ লিসা এবং ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতা আবৃত্তি করেন নিমা রহমান। অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন অভিনেতা তারিক আনাম খান ও হাবিবুর আলম বীর প্রতীক। এছাড়া চিত্রকর ও কার্টুনিস্ট রফিকুন নবী, অভিনেতা কেরামত মওলা, ম হামিদ, শিল্পী মনিরুজ্জামানসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেকেই উপস্থিত ছিলেন এই আয়োজনে।
চিত্রশিল্পী রফিকুন নবী বলেন, ষাটের দশকে জয়নুল আবেদীন স্যার আমাদের কাছে মুস্তাফা মনোয়ার স্যারকে নিয়ে আসেন। মুস্তাফা মনোয়ার স্যার আমাদের শিল্পের ব্যাকরণের বাইরে মুক্তভাবে শিল্পচর্চার অনুপ্রেরণা দিলেন। সরকারি নির্দেশে যখন রবীন্দ্রবিরোধীতা চলে তিনি তখন চারুকলায় রবীন্দ্রসংগীতের আয়োজন ও 'ডাকঘর' নাটক মঞ্চায়ন করেছিলেন। শিল্প ও রবীন্দ্রচর্চাকে তিনি একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখতেন। সরকারি চাকরি করেও পরবর্তীতেও বিভিন্ন আন্দোলনে আমাদের সামনে থাকতেন তিনি।
মফিদুল হক বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার শুধু শিল্পী, শিক্ষক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাই ছিলেন না। ভাষা আন্দোলনও করেছেন। সে কারণে জেলও খেটেছেন।
দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে ৯১ বছর বয়সে মৃত্যু হয় মুস্তাফা মনোয়ারের। স্মরণ পর্ষদের পক্ষ থেকে তার অবদানের কথা স্মরণ করে বলা হয়, ভাষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ মিনারের সজ্জা এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পুতুল নাচের মাধ্যমে শরণার্থীদের প্রেরণা জোগাতে মুস্তাফা মনোয়ার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে ‘নতুন কুঁড়ি’ ও ‘মনের কথা’র মতো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে টেলিভিশন মাধ্যমে তিনি দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ ও নতুন প্রজন্মের মনন গঠনে সুদূরপ্রসারী অবদান রেখে গেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ইতিহাসেও তার অবদান অনন্য। ১৯৭৩ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’র টেলিভিশন নাট্যরূপ দেন মুস্তাফা মনোয়ার। শেক্সপিয়ায়ের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকটিও বিটিভিতে প্রচার হয়েছিল তার পরিচালনায়। অনুষ্ঠানে এই দুটি নাটকের অংশবিশেষও প্রদর্শন করা হয়।






