‘একদিন একরাইত পেটে দানা পড়ল না’

প্যারালাইজড ছেলেকে নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় আশ্রয় নেন সৈয়দা বানু। ছবি- আগামীর সময়
‘একদিন একরাইত গেল, পেটে একটা দানা খাওনও পড়ল না। হাত-পা অবশ পোলাডারে লইয়া ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় পইরা আছি। ভিটাবাড়ি বানের পানিতে ভাসতাছে। ক্যামনে কী করমু, বুইঝ্যা উঠতাছি না। ও আল্লাহ, তুমি আমরারে দেখবায়নি!’ কথাগুলো বলতে বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ৮০ বছরের সৈয়দা বানু।
গত বৃহস্পতিবার রাতে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ২০টি গ্রাম প্লাবিত হলে প্যারালাইজড ছেলে আব্দুল আজিজকে (৪০) নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের দোতলার বারান্দায় আশ্রয় নেন তিনি।
দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন সৈয়দা বানু। জানান, রাতে হঠাৎ বাড়িতে পানি ঢুকে পড়লে স্থানীয়দের সহায়তায় ছেলেকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন। বৃদ্ধ স্বামী উদ্দত আলী একে একে ঘরের মালামাল সরিয়ে উঁচু স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদে আশ্রয় নিয়েছে রিনা বেগম (৪০), আব্দুল হামিদ (৫০) ও আমীর আলীদের মতো ১০টি পরিবার। তাদের ভাষ্য, ঘর থেকে একটি মালামালও বের করতে পারেননি। শিশুদের নিয়ে নারীরা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন, আর পুরুষরা কোমরপানিতে দাঁড়িয়ে ঘরের মালামাল রক্ষার চেষ্টা করছেন। প্রায় ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেননি।
আশ্রয়কেন্দ্রের দরজার সামনে যেতেই ক্ষোভ প্রকাশ করে কাঁদেন রিনা বেগম। বলছিলেন, ‘ছবি তুইল্যা কিতা করতায় রে ভাই। আমরার পেট তো ভাত নাই। পারলে সরকার-রে কইয়্যা দুইটা খাওয়ার ব্যবস্থা কইরা দেও।’
ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের সামনেই শাহজালাল উচ্চবিদ্যালয়। সেখানে গবাদি পশু, নারী ও শিশুদের নিয়ে আরও প্রায় ২০টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় আশ্রয় নেওয়ার পর শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ভাত জোটেনি রিকশাচালক নুরুল আমীনের দুই শিশুসন্তানের। পরে এক আত্মীয়ের কাছ থেকে টাকা ধার করে একটি গ্যাস সিলিন্ডার ও কিছু নিত্যপণ্য কিনে এনে ছেলেদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। একই অবস্থা অন্য পরিবারগুলোরও।
বনদক্ষিণ গ্রামের বাসিন্দা মো. আমীর আলী জেলার চুনারুঘাট উপজেলার সিড়িকান্দি ভূমি অফিসের অফিস সহকারী। রাতে ঘর তলিয়ে যাওয়ার পর দুই শিশুকন্যা ও স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে নিজে প্লাবিত ঘরের মালামাল দেখাশোনা করছেন।
তিনি বলেন, ‘বেতনের টাকায় কোনোরকম সংসার চালাই। বানে ঘরের ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৫ লাখ টাকার। এই ক্ষতি কিভাবে কাটিয়ে উঠব ভেবে পাচ্ছি না। কর্মস্থলে যেতে পারব না কয়েকদিন।’
ওইদিন রাতে ইউনিয়নের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ঢলের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। মুহূর্তেই প্লাবিত হয় অন্তত ২০টি গ্রামের কয়েক হাজার বসতবাড়ি। বাস্তুচ্যুত হয় প্রায় ছয় হাজার পরিবার। কয়েকটি ইটভাটা ও অর্ধশতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নিমিষেই তলিয়ে যায়।
রাতের মধ্যেই নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদিসহ আশপাশের গ্রাম প্লাবিত হয়। অনেকেই গবাদি পশু নিয়ে বাঁধের ওপর ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন।
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সাহেব আলী জানান, প্রত্যেকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষ। অনেককে পড়তে হবে ঋণের বেড়াজালে।
হবিগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের সাবেক সভাপতি মর্তুজা ইমতিয়াজের শ্বশুরবাড়িও কালীগঞ্জে। পরিবারের সদস্যরা গবাদি পশুসহ আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরে ঢুকে পড়া পানিতে আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় মালামাল নষ্ট হয়েছে। তার ভাষ্য, প্রত্যেকটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একই অবস্থা।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ্-আবু-জাহের বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার। তাদের জন্য ধারাবাহিকভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। সবাইকে শুকনো খাবার ও খিচুড়ি দেওয়া হবে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, সাত বছর আগে ২০১৭ সালে ভারতের পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। তখনও হবিগঞ্জ বাঁধ ভাঙেনি। যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবার ২২১ সেন্টিমিটার হয়েই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলনের ফলে গত সাত বছরে নদীর তলদেশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, পানি ধারণক্ষমতা কমে গেছে। এ কারণে আগের তুলনায় ৮৭ সেন্টিমিটার কম পানি হলেও নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং শহররক্ষা বাঁধ ধসে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দেয়।





