দুর্ঘটনা থেকে বাঁচালেন ক্যাপ্টেন আসিফ

দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়া জাহাজ ‘গ্যাস হারমোনি’
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলকে বাঁচিয়ে বিশ্বমঞ্চে বীরত্বের এক অনন্য নজির স্থাপন করলেন ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ। বিশ্বের মেরিটাইম খাতে সাহসিকতার জন্য প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) সম্মাননা পেলেন তিনি। একে বলা হয় ‘লেটার অব কমেন্ডেশন’ বা বিশেষ প্রশংসাপত্র।
ঘটনাটি ঘটে ২০ জানুয়ারি ২০২৬ সালে সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রাণকেন্দ্র কর্ণফুলী চ্যানেল বা প্রবেশপথ তখন প্রতিদিনের মতোই ব্যস্ত। ৫১৫ টন প্রোপেন এবং ৪ হাজার ৫৭০ টন বিউটেন— অর্থাৎ বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস নিয়ে ১৫৯.৯ মিটার দীর্ঘ ‘গ্যাস হারমোনি’ জাহাজ সাগর থেকে চ্যানেলে আসছিল। ভেড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণপাড়ের ইউনাইটেড গ্রুপের জেটিতে। ঠিক তখনই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাহাজটি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে।
দাহ্যপদার্থ বহনকারী জাহাজ ভাসতে ভাসতে যেতে লাগল পাশে থাকা সার প্রস্তুতকারী বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান কাফকো অ্যামোনিয়া জেটির দিকে। এই কাফকোতেও আছে দাহ্যপদার্থ। জেটিতে গিয়ে সামান্য একটু ধাক্কা বা আগুনের ফুলকি মানেই চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত বিমানবন্দর এবং আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ বিশাল এলাকা মুহূর্তের মধ্যে এক নরককুণ্ড হয়ে যেত! জাহাজে থাকা ২৪ বিদেশি নাবিকের অকালমৃত্যুর শঙ্কাও ছিল।
তখন সেই জাহাজ চালাচ্ছিলেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদ। চোখের পলকে পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরেছিলেন তিনি। তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা আর সাহসিকতার চূড়ান্ত পরীক্ষা এলো তার সামনে। তিনি দ্রুত জাহাজের নোঙর ফেলার এবং একই সঙ্গে শক্তিশালী টাগবোট ব্যবহার করে জাহাজের গতি কমিয়ে সেটিকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেন। তিনি জাহাজটি কৌশলে নিরাপদে সরিয়ে নেন এবং নিখুঁত দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণহীন ‘গ্যাস হারমোনি’র দিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হন। জাহাজটি কাফকো জেটি থেকে মাত্র ১ দশমিক ২ মিটার দূরে এসে পুরোপুরি থেমে যায়, রক্ষা পায় বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে। আসিফ আহমেদের বাবার বাড়ি টাঙ্গাইলে। চট্টগ্রামে জন্ম আসিফের। বেড়ে ওঠা ও পড়ালেখা এখানে। তিনি বললেন, ‘জাহাজটি বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়তে যাচ্ছিল। সেটি বাঁচানোর সব প্রস্তুতি নেওয়া হয় মুহূর্তের সিদ্ধান্তে। পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানের বাইরে নিজস্ব বুদ্ধি খাটিয়েই কৌশলে জাহাজটি থামাতে সক্ষম হই।’
মেরিন একাডেমির ৪১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আসিফের নেওয়া প্রতিটি সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত এতটাই নির্ভুল ছিল যে, শেষপর্যন্ত মাত্র ১ মিটার দূরত্বে জাহাজ থামিয়ে দেওয়ায় বড় কোনো বিপর্যয় ঘটেনি। সেদিন চট্টগ্রাম শহরের ৭০ লাখ মানুষ, কর্ণফুলী তীরের হাজারো পরিবার হয়তো জানতই না এমন একটি সম্ভাব্য বিপদ থেকে একজন নাবিক কীভাবে তাদের বাঁচিয়ে দিলেন। বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও মেরিন একাডেমির ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী ক্যাপ্টেন আসিফের প্রশংসা করলেন, ‘তার বিচক্ষণতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেটি সফল হওয়া আমাদের জন্য অনন্য অনুকরণীয় ঘটনা।’
এ কর্ণফুলী চ্যানেল দিয়ে দেশের ৯২ শতাংশেরও বেশি বাণিজ্য পরিচালিত হয়। কোনো কারণে গ্যাস ট্যাংকারটির বিস্ফোরণ ঘটলে বন্ধ হয়ে যেত দেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন চট্টগ্রাম বন্দর। থমকে যেত পুরো দেশের আমদানি-রপ্তানি, পঙ্গু হয়ে পড়ত অর্থনীতি। বিপদে পড়ত এই নদী ও বন্দরনির্ভর লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা।
চলতি সপ্তাহে ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন যখন তাদের মর্যাদাপূর্ণ ‘২০২৬ আইএমও অ্যাওয়ার্ড ফর এক্সেপশনাল ব্রেভারি অ্যাট সি’ ঘোষণা করে, তখন সেখানে আসা বিশ্বের ৫০টির বেশি মনোনয়নের মধ্যে জ্বলজ্বল করে ওঠে বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন আসিফ আহমেদের নাম। আগামী ১৪ ডিসেম্বর লন্ডনে আইএমওর সদর দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ‘লেটার অব কমেন্ডেশন’ বা বিশেষ প্রশংসাপত্র দেওয়া হবে।




