সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদম: যেভাবে বদলে দিচ্ছে সমাজ
- অ্যালগরিদম ঠিক করছে আমরা কী দেখব, কী ভাবব
- এর প্রভাব পড়ছে সমাজের চিন্তা ও আচরণে

সংগৃহীত ছবি
মোবাইলের স্ক্রল থামানো এখন কঠিন। একের পর এক ভিডিও, পোস্ট, খবর সবকিছু যেন ঠিক আমাদের পছন্দমতো সাজানো। আমরা যা দেখতে চাই, সেটাই সামনে আসে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই নিজের পছন্দে দেখছি, নাকি অদৃশ্য কোনো ব্যবস্থার প্রভাবে?
এই অদৃশ্য ব্যবস্থার নাম অ্যালগরিদম। ফেসবুক, ইউটিউব,টিকটক প্রতিটি প্ল্যাটফর্মেই ব্যবহার করা হচ্ছে জটিল অ্যালগরিদম। যা ব্যবহারকারীর আচরণ বিশ্লেষণ করে তার সামনে কনটেন্ট তুলে ধরে।
এই অ্যালগরিদম মূলত কাজ করে একটি লক্ষ্য নিয়ে। ব্যবহারকারীকে যত বেশি সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা যায়। আপনি কোন ভিডিওতে বেশি সময় থাকছেন, কোন পোস্টে লাইক দিচ্ছেন, কী শেয়ার করছেন এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি হয় একটি ডিজিটাল প্রোফাইল। এরপর সেই অনুযায়ী কনটেন্ট সাজিয়ে দেওয়া হয়।
প্রথম দেখায় এটি সুবিধাজনক মনে হয়। কারণ এতে ব্যবহারকারী তার পছন্দের বিষয়বস্তু সহজেই পেয়ে যায়। কিন্তু এর প্রভাব শুধু ব্যক্তিগত নয়; এটি ধীরে ধীরে সমাজকেও প্রভাবিত করছে।
অ্যালগরিদম কী
অ্যালগরিদম হচ্ছে যে কোনো কাজের প্রণালী বা ধাপে ধাপে কোনো কিছু করার প্রক্রিয়া। রন্ধনপ্রণালীর সঙ্গে এর তুলনা দিয়ে এটি সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। ভাত রান্না করার সময় প্রথমে একটি পাত্রে চাল নেওয়া হয়। তারপর তাতে পানি ঢালা হয়, চাল কয়েকবার ধোওয়ার পর সেটি রাখা হয় চুলার ওপরে। তারপর চুলা জ্বালাতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিই অ্যালগরিদম।
আয়ারল্যান্ডে তথ্য প্রযুক্তিবিদ নাসিম মাহ্মুদ। তিনি ডাবলিনে চিকিৎসা ও উদ্ভাবন সংক্রান্ত আমেরিকান একটি প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড হেলথ গ্রুপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলছেন, ‘কম্পিউটারকেও একটি কাজ করার জন্য ওই কাজটিকে বিভিন্ন ধাপে ভাগ করে দেওয়া হয়, যাতে কম্পিউটার সেটা সহজে বুঝতে পারে এবং সেই নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করতে পারে।’
‘কম্পিউটার নিজে কোনো কাজ করতে পারে না। তবে তার রয়েছে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা। তাকে কিছু পদ্ধতি বলে দেওয়া হয় যাতে সে তার খুব কম বুদ্ধি দিয়ে কাজটা সম্পাদন করতে পারে। প্রক্রিয়াগুলো সূক্ষ্ম ও সরলভাবে দেওয়া থাকে যেন কাজটা সে কিছু গাণিতিক ধাপের মাধ্যমে শেষ করতে পারে। এসব নির্দেশনাই অ্যালগরিদম।’— যোগ করেন তিনি।
মতামতের ‘বুদবুদ’
অ্যালগরিদমের কারণে মানুষ ধীরে ধীরে একই ধরনের মতামতের মধ্যে আটকে পড়ছে, যাকে বলা হয় ‘ইকো চেম্বার’। এ বিষয়ে Pew Research Center বলছে, সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ধীরে ধীরে নিজেদের মতের ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন, ফলে ভিন্ন মতের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যাচ্ছে এবং মতবিরোধ বাড়ছে।
আপনি যদি একটি নির্দিষ্ট মতের কনটেন্ট বেশি দেখেন, অ্যালগরিদম আপনাকে আরও একই ধরনের কনটেন্ট দেখাবে। ফলে ভিন্ন মতামতের সঙ্গে যোগাযোগ কমে যায়।
ভুয়া তথ্যের দ্রুত বিস্তার
অ্যালগরিদম সাধারণত এমন কনটেন্টকে বেশি ছড়ায়, যা বেশি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। আর এখানেই তৈরি হয় বড় ঝুঁকি। চমকপ্রদ বা আবেগনির্ভর তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় সত্য তথ্যের চেয়ে ভুয়া তথ্য বেশি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
Massachusetts Institute of Technology-এর ২০১৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্য সত্য তথ্যের তুলনায় দ্রুত ও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকদের মতে, মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি পাওয়া কনটেন্টকেই অ্যালগরিদম অগ্রাধিকার দেয়। ফলে ভুল তথ্য মানুষের মতামত, সিদ্ধান্ত এবং আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখতে তাকে ক্রমাগত নতুন কনটেন্ট দেখাতে থাকে। ফলে মানুষ দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে আটকে থাকে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের তুলনা এবং ‘লাইক’-নির্ভর মানসিকতা এসব বিষয় মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে।
এ বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলছে, অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াতে পারে।
সমাজে আচরণগত পরিবর্তন
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম শুধু তথ্য নয়, মানুষের আচরণও প্রভাবিত করছে। মানুষ এখন এমন কনটেন্ট তৈরি করতে আগ্রহী, যা দ্রুত ভাইরাল হবে। ফলে অনেক সময় তথ্যের মানের চেয়ে জনপ্রিয়তাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর ফলে ধীরে ধীরে একটি ‘দেখানোর সংস্কৃতি’ তৈরি হচ্ছে। যেখানে বাস্তবতার চেয়ে উপস্থাপন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অ্যালগরিদম কি নিরপেক্ষ
অ্যালগরিদমকে অনেক সময় নিরপেক্ষ মনে করা হলেও বাস্তবে এটি মানুষের তৈরি। ফলে এর ভেতরে পক্ষপাত থাকার সম্ভাবনা থাকে। কোন কনটেন্ট বেশি দেখানো হবে, কোনটি কম এই সিদ্ধান্তগুলো নির্ভর করে নির্দিষ্ট নিয়মের ওপর। কিন্তু সেই নিয়মগুলো কে নির্ধারণ করছে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
করণীয় কী
অ্যালগরিদমের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। তবে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। ব্যবহারকারীদের উচিত ভিন্ন ধরনের কনটেন্ট দেখা, তথ্য যাচাই করা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বাইরে বাস্তব জগতের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখা। একই সঙ্গে প্ল্যাটফর্মগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম আমাদের জীবনকে সহজ করেছে কিন্তু একই সঙ্গে জটিলও করে তুলেছে। আমরা কী দেখছি, কী ভাবছি অনেকটাই নির্ধারিত হচ্ছে এই অদৃশ্য ব্যবস্থার মাধ্যমে। প্রশ্নটি তাই এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ, আমরা কি অ্যালগরিদমকে ব্যবহার করছি, নাকি অ্যালগরিদমই আমাদের ব্যবহার করছে?

