সজারু
কাঁটাভরা ছোট্ট শরীর, পিঠে বাঁচার প্রযুক্তি

সংগৃহীত ছবি
রাত গভীর হলে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ে সে। ছোট ছোট পায়ে ধীরে হাঁটে বাগানের ভেজা ঘাসের ওপর। কোথাও শুকনো পাতার স্তূপ, কোথাও ঝোপের আড়াল, কোথাও আবার কাঠের গাদার পাশে থেমে খাবার খোঁজে। অন্ধকারের এই ছোট্ট পথিককে অনেকেই হয়তো খেয়ালই করেন না। অথচ ইউরোপের শহর আর গ্রাম জুড়ে একসময় খুব পরিচিত এই প্রাণীটিই এখন হারিয়ে যেতে বসেছে। যার নাম সজারু (হেজহগ)। কাঁটাভরা ছোট্ট এক স্তন্যপায়ী প্রাণী।
এক সময় ইউরোপের প্রতিটি বাগানে দেখা মিলত সজারুর। রাত হলেই খাবারের খোঁজে বেরিয়ে পড়ত তারা। বাগানের শামুক, ছোট ছোট পোকামাকড় খেয়ে পরিবেশের ভারসাম্যও রক্ষা করত। তাই অনেকেই হেজহগকে ‘মালিদের বন্ধু’ ডাকেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে পরিবেশ, বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। আর সেই পরিবর্তনের চাপেই কমতে শুরু করেছে হেজহগের সংখ্যা।
এখন পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক, পশ্চিম ইউরোপের সাধারণ হেজহগকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর দ্য কনজারভেশন অব ন্যাচার।
আমরা জানতে চাই হেজহগ কীভাবে শহরের ভেতর চলাফেরা করে। তারা কোথায় আটকে যায়, কোথায় নিরাপদ বোধ করে এসব তথ্যই ভবিষ্যতে তাদের রক্ষায় কাজে লাগবে
তবে বিজ্ঞানীরা হাল ছাড়েননি। এই ছোট্ট প্রাণীটি বাঁচাতে তারা এখন ব্যবহার করছেন প্রযুক্তি, আর সাহায্যে আছে বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত এক কুকুরও।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সম্প্রতি শুরু হয়েছে এক অভিনব গবেষণা প্রকল্প। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছে আলস্টার ওয়াইল্ডলাইফ। গবেষকরা হেজহগের পিঠে বসাচ্ছেন ছোট্ট একটি জিপিএস ডিভাইস, যা দেখতে অনেকটা ব্যাকপ্যাকের মতো। সেই ডিভাইসের সাহায্যে জানা যাচ্ছে, রাতভর হেজহগ কোথায় যায়, কতদূর হাঁটে, কোথায় খাবার খুঁজে পায় কিংবা কোথায় বিশ্রাম নেয়।
প্রথম দেখায় বিষয়টি অদ্ভুত মনে হতে পারে। কিন্তু গবেষকদের কাছে এটি এখন সজারু রক্ষার অন্যতম হাতিয়ার।
ছোট্ট সেই ডিভাইসটি খুব সতর্কতার সঙ্গে হেজহগের শরীরে লাগানো হয়। গবেষকরা বলছেন, ‘এতে প্রাণীটির স্বাভাবিক চলাফেরায় কোনো সমস্যা হয় না। এমনকি সজারু নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে গোল হয়ে গুটিয়েও যেতে পারে।’
তবে এই প্রকল্পে শুধু পুরুষ হেজহগকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে। কারণ গবেষকরা চান না, বাসা বাঁধা স্ত্রী হেজহগ বা তাদের বাচ্চাদের কোনো ধরনের বিরক্তির মুখে পড়তে হোক।
হেজহগ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি বাগানে হেজহগ থাকা মানে সেখানে এখনো পোকামাকড়, গাছপালা ও ছোট প্রাণীদের একটি স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে। তাই এখন শুধু গবেষণাই নয়, সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে
গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই বুঝতে চেষ্টা করছেন—হেজহগ আসলে কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামাঞ্চলের তুলনায় শহর ও নগরের বাগানগুলোতেই এখন তুলনামূলক বেশি আশ্রয় নিচ্ছে হেজহগ। কারণ সেখানে এখনো কিছুটা খাবার ও লুকিয়ে থাকার জায়গা পাওয়া যায়। কিন্তু শহুরে পরিবেশও তাদের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ নয়।
রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ির নিচে চাপা পড়ছে অনেক হেজহগ। আধুনিক বাগানে বড় বড় দেয়াল বা বন্ধ বেড়ার কারণে এক বাগান থেকে আরেক বাগানে যেতে পারছে না তারা। বিষাক্ত কীটনাশক ও শামুকনাশক কমিয়ে দিচ্ছে তাদের খাবারের উৎস।
আর এসব কারণেই গবেষকদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ হেজহগের চলাফেরার তথ্য।
আলস্টার ওয়াইল্ডলাইফের কর্মকর্তা কেটি বেল বলছেন, ‘আমরা জানতে চাই হেজহগ কীভাবে শহরের ভেতর চলাফেরা করে। তারা কোথায় আটকে যায়, কোথায় নিরাপদ বোধ করে। এসব তথ্যই ভবিষ্যতে তাদের রক্ষায় কাজে লাগবে।’
এই অভিযানে সবচেয়ে চমকপ্রদ সদস্য হয়তো রাসেল। এটি দেখতে সাধারণ এক ককার স্প্যানিয়েল কুকুর। বয়স মাত্র দুই বছর। কিন্তু তার ঘ্রাণশক্তি অসাধারণ। তাকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে হেজহগ খুঁজে বের করার জন্য।
রাসেলের প্রশিক্ষক প্যাট্রিস কেরিগান জানান, এর আগে তার আরও দুটি কুকুর উইন্ড টারবাইনের আশপাশে বাদুড় ও পাখির মৃতদেহ খুঁজে বের করার কাজ করত। কিন্তু রাসেলকে দেওয়া হয়েছে ভিন্ন এক দায়িত্ব।
হেজহগদের খুঁজে বের করা
কখনো কোনো হেজহগ খাবারের জায়গায় আসে না। তখন রাসেল তার ঘ্রাণশক্তি দিয়ে বুঝে ফেলে প্রাণীটি কোথায় লুকিয়ে আছে। আবার অনেক সময় হেজহগের শরীরে লাগানো ট্র্যাকিং ডিভাইস খুলে পড়ে যায় কিংবা সংকেত পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তখন গবেষকদের কাছে হেজহগ যেন অন্ধকারে হারিয়ে যায়। সেই হারিয়ে যাওয়া সংকেত খুঁজে দিতেও সাহায্য করে রাসেল।
বাড়ির বাগানে ছোট কিছু পরিবর্তন আনলেই হেজহগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। যেমন- বাগানের বেড়ায় ছোট ফাঁকা জায়গা রাখা, যাতে হেজহগ সহজে এক বাগান থেকে অন্য বাগানে যেতে পারে। এটিকে বলা হচ্ছে ‘হেজহগ হাইওয়ে’
কেরিগান বলেছেন, ‘রাসেল যেন আমাদের চোখের আড়ালে চলে যাওয়া হেজহগদের ফিরিয়ে আনে।’
গবেষকরা বলছেন, হেজহগ শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি পুরো পরিবেশ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি বাগানে হেজহগ থাকা মানে সেখানে এখনো পোকামাকড়, গাছপালা ও ছোট প্রাণীদের একটি স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র টিকে আছে। তাই এখন শুধু গবেষণাই নয়, সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাড়ির বাগানে ছোট কিছু পরিবর্তন আনলেই হেজহগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। যেমন— বাগানের বেড়ায় ছোট ফাঁকা জায়গা রাখা, যাতে হেজহগ সহজে এক বাগান থেকে অন্য বাগানে যেতে পারে। এটিকে বলা হচ্ছে ‘হেজহগ হাইওয়ে’।
কারণ একটি বাগানে হেজহগের সব প্রয়োজন মেটে না। খাবার, পানি কিংবা সঙ্গীর খোঁজে তাদের অনেক দূর হাঁটতে হয়। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি হেজহগ এক রাতে প্রায় তিন কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দিতে পারে। এ ছাড়া বাগানে অগভীর পানির পাত্র রাখা, কাঠ বা শুকনো পাতার গাদা তৈরি করা এবং পরাগায়নবান্ধব গাছ লাগানোও হেজহগের জন্য উপকারী হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন ঘাস কাটার যন্ত্র বা বৈদ্যুতিক লনমাওয়ার ব্যবহারের আগে। কারণ ঝোপ বা ঘাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট হেজহগ অনেক সময় এসব যন্ত্রের আঘাতে মারা যায়।
হয়তো পৃথিবীর বড় বড় সংকটের ভিড়ে হেজহগের গল্প খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু এই ছোট্ট প্রাণীটির হারিয়ে যাওয়া আসলে প্রকৃতির নীরব পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত।
তাই রাতের অন্ধকারে যখন কোনো হেজহগ পিঠে ছোট্ট জিপিএস নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলে, তখন সেটি শুধু একটি প্রাণীর পথচলা নয় বরং মানুষ, প্রযুক্তি আর প্রকৃতির একসঙ্গে বাঁচার চেষ্টার গল্পও বটে।
ভাষান্তর: মনির হোসেন রনি









