সর্বোচ্চ উচ্চতার ডাকঘর এভারেস্ট বেস ক্যাম্প

ডাকঘরের নাম হ্যাভেনলি টিবেট থিমড পোস্ট অফিস-এভারেস্ট ব্রাঞ্চ বা ‘স্বর্গীয় তিব্বত থিম ডাকঘর
বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় চালু থাকা ডাকঘরটি তিব্বতের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। সেখানে কারা কাজ করেন, কারা চিঠি পাঠান পৃথিবীর ছাদে দাঁড়িয়ে সেই বিস্ময়কর ডাকঘর ঘুরে এসে লিখেছেন এলিজা বিনতে এলাহী
নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। চারদিকে বরফে ঢাকা ধূসর প্রান্তর, কনকনে ঠান্ডা বাতাস, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। মাথার ওপর বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বত এভারেস্ট। এমন এক জায়গায়, যেখানে মানুষ কয়েক ঘণ্টা থাকলেই উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় ভুগতে পারেন, সেখানে একটি ডাকঘর!
কাচের দরজার ওপাশে মানুষের ভিড়। কেউ পোস্টকার্ড লিখছেন, কেউ খামের মুখ বন্ধ করছেন, কেউ আবার নিজের সন্তানের উদ্দেশে কয়েকটি লাইন লিখে কাউন্টারে জমা দিচ্ছেন। কয়েক দিন পর সেই চিঠি পৌঁছে যাবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে।
১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় দাঁড়ানো অভিভূত আমি ঢুকে পড়লাম পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতায় পরিচালিত ডাকঘরটিতে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই চীনের বিখ্যাত ৩১৮ নম্বর মহাসড়ক ধরে পৌঁছেছি তিব্বতের এভারেস্ট বেস ক্যাম্পে। ততক্ষণে বিকাল গড়িয়ে গেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল ছোট ছোট আধুনিক তাঁবুর সারি। বাইরে মাইনাস দশ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রা, চারদিকে বরফের চাদর। অথচ তাঁবুর ভেতরে বিদ্যুৎ, গরম কম্বল, এমনকি মোবাইল চার্জ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ব্যাগ রেখে আর দেরি করলাম না। সূর্যাস্তের আগে এভারেস্টকে দেখতে হবে।
তাঁবুর সারি পেরিয়ে পৌঁছালাম বিশাল এক চত্বরে। মাঝখানে প্রাচীন তিব্বতি নিবেদনপাত্রের আদলে নির্মিত একটি ব্রোঞ্জের স্মৃতিস্তম্ভ। চারদিক থেকে সিঁড়ি উঠে গেছে তার দিকে। চত্বর পেরিয়ে কাঠের পথ ধরে এগোতেই সামনে দাঁড়িয়ে গেল চোমোলুংমা— ,আমাদের পরিচিত এভারেস্ট।
শীতল বাতাস মুখে ছুরি চালাচ্ছে। সামনে ৩১৮ নম্বর মহাসড়কের ফলক আর উচ্চতা লেখা একটি পাথর। ছবি তোলার চেয়ে আমার মন পড়ে ছিল পাহাড়ের দিকে। নেপালের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প থেকেও এভারেস্ট দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিন্তু তিব্বতের এদিক থেকে শৃঙ্গটিকে অনেক বেশি স্পষ্ট আর মহিমান্বিত মনে হয়েছে।
শেষ আলো নিভে গেলে ঠান্ডা হঠাৎ করেই তীব্র হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে তাঁবুর দিকে ফিরলাম।
আমার তাঁবুতে তিনটি কক্ষ, একটি বসার জায়গা, গরম পানির ব্যবস্থা, দুটি বিছানা, বিদ্যুৎ আর গরম কম্বল সব মিলিয়ে চমৎকার ব্যবস্থা। পর্যটকদের জন্য তিব্বতের বেস ক্যাম্পকে অনেক বেশি সহজলভ্য করে তুলেছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ঘর দেখে আবার বাইরে বেরোলাম। ঠান্ডা আরও বেড়েছে। পরিচিত কাউকে দেখলাম না। একাই হাঁটছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল একটি সাইনবোর্ডে।
ডাকঘর। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, ভুল দেখছি। ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় ডাকঘর!
ভেতরে ঢুকে দেখলাম বড় হলঘরটি পর্যটকে ভরা। সামনে কাউন্টারে দুজন কর্মী। একজন পোস্টকার্ড আর খাম দিচ্ছেন, অন্যজন দ্রুত ডাকের সিল মারছেন। দেয়াল জুড়ে সাজানো স্মারক, ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড। একটি বোর্ডে সারি সারি হাতে লেখা বার্তা।
আমাদের দেশে এখন ডাকবাক্সই প্রায় হারিয়ে গেছে। প্রেমপত্রও চলে গেছে মোবাইলের পর্দায়। অথচ পৃথিবীর ছাদে দাঁড়িয়ে মানুষ এখনো খাম খুলে কলম ধরছে।
ডাকঘরের নাম হ্যাভেনলি টিবেট থিমড পোস্ট অফিস-এভারেস্ট ব্রাঞ্চ বা ‘স্বর্গীয় তিব্বত থিম ডাকঘর— এভারেস্ট শাখা’। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার বা ১৭ হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এ ডাকঘরটিকেই বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতায় পরিচালিত স্থায়ী ডাকঘর হিসেবে ধরা হয়। অবশ্য আশ্চর্য কোনো কারণে গিনেজ বুকে সবচেয়ে উচ্চতার ডাকঘর হিসেবে এর থেকে অনেক কম উঁচুতে অবস্থিত একটি ডাকঘরের নাম এসেছে। এভারেস্টের চূড়া এখান থেকে সরলরেখায় মাত্র ১৯ কিলোমিটার দূরে।
কয়েকটি পোস্টকার্ড আর খাম কিনে কাউন্টারে রাখলাম। অপেক্ষা করতে করতে চোখে পড়ল একটি বড় ব্যানার। একজন তরুণীর ছবি, নিচে চীনা ভাষায় দীর্ঘ লেখা। ভালো করে তাকিয়ে চমকালাম, ছবির মানুষটি আর কাউন্টারে বসে থাকা কর্মী একই ব্যক্তি। কৌতূহল দেখাতে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে গল্প শুরু করলেন। চেমো নামের এই নারীর কাছ থেকেই জানলাম এ ডাকঘরের অজানা ইতিহাস। তিনি ২০১১ সাল থেকে এখানে কাজ করছেন। অক্সিজেনস্বল্পতা, প্রচণ্ড ঠান্ডা আর দীর্ঘ সময়ের বিচ্ছিন্নতা— সবকিছুর মধ্যেও বছরের পর বছর পর্যটকদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার ছবির নিচের ব্যানারটি তার নিষ্ঠার স্বীকৃতি।
চেমো তিব্বতি জাতিসত্তার মানুষ। ডাকবিভাগে দীর্ঘদিনের কাজের জন্য তিব্বতের ডাকব্যবস্থার একাধিক শ্রেষ্ঠ কর্মী সম্মাননা, ‘মে দিবস শ্রম পদক’সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার পেয়েছেন। প্রতিদিন হাজারো পর্যটকের হাতে পোস্টকার্ড তুলে দেওয়া, ডাকটিকিটে সিল মারা, তিব্বতের ইতিহাস আর সংস্কৃতি সম্পর্কে তাদের জানানো এ কাজই তার জীবনের অংশ। আমি জানতে চাইলাম, এত উঁচুতে কাজ করতে কষ্ট হয় না? হেসে বললেন, ‘শুরুতে হতো। এখন এটাই আমার পৃথিবী।’
বিদায় নেওয়ার আগে একটি খামের ওপর তার স্বাক্ষর নিলাম, তিব্বতি, চীনা ও ইংরেজি— তিন ভাষায়। তিনি আবার নিজের মোবাইলে আমার সঙ্গে একটি ছবি তুলে রাখলেন।
রাতের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছিল। ডাইনিং হলে পৌঁছে দেখি আমিই প্রথম। হাতে ধোঁয়া ওঠা কফির মগ। বাইরে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত আর কিছু দূরে আলো জ্বেলে কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের সর্বোচ্চ উচ্চতার ডাকঘর।





