দুই হাজার বছরের পুরনো শহরের গল্প

ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, জার্মানি ও লুক্সেমবার্গের কাছাকাছি শহর মেৎস। দুই হাজার বছরের প্রাচীন এ শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ফুরকান উদ্দিন
ফ্রান্সে আমার প্রবাসজীবনের শুরু ২০১১ সালে। যে শহরটিকে আমি আজ নিজের দ্বিতীয় বাড়ি বলে মনে করি, তার নাম মেৎস।
ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, জার্মানি ও লুক্সেমবার্গের কাছাকাছি মেৎস। মোজেল বিভাগের প্রধান শহর এবং গ্রঁদ এস্ত অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। পুরো শহরে প্রায় তিন লাখ মানুষের বাস।
প্রথম যখন এখানে আসি, তখন পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন ছিল। মনে হয়, আমিই ছিলাম এ শহরের প্রথম বাংলাদেশি। অন্তত কোনো বাংলাভাষী মানুষের দেখা পাইনি। ফরাসি ভাষা জানতাম না, পরিচিত কেউ ছিল না। নতুন দেশ, নতুন সংস্কৃতি, নতুন ভাষা— সব মিলিয়ে পরিস্থিতিটা ছিল সত্যি কঠিন।
তবে ধীরে ধীরে ফরাসি ভাষা শিখলাম, কাজের সুযোগ তৈরি হলো, মানুষের সঙ্গে পরিচয় বাড়ল। এখন সময় বদলেছে। আজ মেৎস শহর ও আশপাশে কয়েকশ বাঙালি বসবাস করেন। এর মধ্যে ৬০-৭০টির মতো বাংলাদেশি পরিবারও রয়েছে। একসময় যে শহরে আমি একা ছিলাম, আজ সেখানে নিজের দেশের মানুষদের মুখ দেখলে অন্যরকম ভালো লাগে।
মেৎস খুব বড় শহর নয়। কিন্তু এর সৌন্দর্য অন্য জায়গায়। শহরটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন, শান্ত আর গোছানো। চারদিকে সবুজ, নদী, পুরনো স্থাপত্য আর আধুনিক নগরজীবনের অপূর্ব সমন্বয়।
প্রথম দিন থেকেই শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল। মোজেল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা কিংবা পঁ দে মোর সেতুর আশপাশের দৃশ্য এখনো আমার কাছে স্বপ্নের মতো লাগে। ইউরোপের যে ছবিগুলো আমরা ক্যালেন্ডারে দেখি— নদী, গাছপালা, পুরনো সেতু আর সবুজ প্রকৃতি— মেৎস ঠিক তেমনই একটি শহর।
ফ্রান্সের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে, জার্মানি ও লুক্সেমবার্গের কাছাকাছি শহর মেৎস। দুই হাজার বছরের প্রাচীন এ শহরে বসবাসের অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখেছেন ফুরকান উদ্দিন
এখানকার মানুষও খুব আন্তরিক। ধর্ম, ভাষা কিংবা সংস্কৃতি নিয়ে কারও মধ্যে সংকীর্ণতা দেখিনি। সবাই নিজের বিশ্বাস ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করে। এত ভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মানুষ একসঙ্গে থেকেও যে সুন্দর একটি সমাজ গড়ে তুলতে পারে, মেৎস তার দারুণ উদাহরণ।
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্যও এ শহর এক রত্নভাণ্ডার। প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো মেৎস একসময় রোমান সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নগর ছিল। পরে ক্যারোলিনজিয়ান সাম্রাজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পায়। ইতিহাসের নানা সময়ে শহরটি কখনো ফ্রান্স, কখনো জার্মানির অধীনে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও মেৎস ছিল ভয়াবহ যুদ্ধের সাক্ষী। শহর ঘুরতে বের হলে প্রথমেই চোখে পড়ে সাঁ-তেইতিয়েন ক্যাথেড্রাল। ত্রয়োদশ শতকে যার নির্মাণ শুরু হয়েছিল এবং শেষ হতে প্রায় তিন শতাব্দী লেগেছিল। ইউরোপের অন্যতম বড় গথিক ক্যাথেড্রাল এটি। বিশাল রঙিন কাচের জানালাগুলো দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে ঢোকার দৃশ্য ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এ ছাড়া পোর্ত দেজ আলেমঁ, সঁত্র পম্পিদু-মেৎস, টেম্পল ন্যুফ, মেৎস অপেরা থিয়েটার এবং শহরের পুরনো রাস্তা ও চত্বরগুলোও পর্যটকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
গ্রীষ্মকালে মেৎস যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে মানুষ এখানে বেড়াতে আসে। নদীতে ছোট ছোট নৌকার প্রতিযোগিতা হয়, নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন চলে। পুরো শহর উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। কয়েক মাস আগে বাংলাদেশ থেকে আমার এক বন্ধু এসেছিল। শহর ঘুরে সে বারবার বলছিল, ‘ছবিতে যতটা সুন্দর দেখেছি, বাস্তবে তার চেয়েও সুন্দর।’
যোগাযোগব্যবস্থার দিক থেকেও মেৎস অসাধারণ। এখানকার কেন্দ্রীয় রেলস্টেশনটি নিজেই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। জার্মান সাম্রাজ্যের আমলে নির্মিত এ স্টেশনের বিশাল ঘড়ির টাওয়ার দূর থেকেই নজর কাড়ে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দ্রুতগতির টিজিভি ট্রেন। মাত্র এক ঘণ্টা দশ মিনিটে প্যারিস পৌঁছে যাওয়া যায়। আবার জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড কিংবা ইতালিতেও সহজে যাওয়া যায়।
খেলাধুলার ক্ষেত্রেও মেৎসের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। এখানকার জনপ্রিয় ফুটবল ক্লাব এফসি মেৎস। ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরেই ফরাসি পেশাদার ফুটবলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। খেলার দিন পুরো শহরের পরিবেশই বদলে যায়। স্টেডিয়ামের আশপাশে মানুষের উচ্ছ্বাস দেখলে বোঝা যায়, ফুটবল ইউরোপীয়দের জীবনের কতটা বড় অংশ।
মেৎসে মুসলিম জনগোষ্ঠীও বেশ বড়। বিশেষ করে আলজেরিয়া, মরক্কো, তিউনিসিয়া ও তুরস্কের মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। আমার বাসা থেকে অল্প হাঁটার দূরত্বেই একটি বড় মসজিদ রয়েছে। সেখানে একসঙ্গে প্রায় ১ হাজার ৭০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় এ শহরের চেহারাই বদলে যায়। মরক্কো বা আলজেরিয়ার খেলা থাকলে তাদের আনন্দ-উল্লাস দেখে মনে হয়, যেন ফ্রান্স নয়, উত্তর আফ্রিকার কোনো শহরে আছি। তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে এখানকার চিকিৎসাব্যবস্থা। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যসেবা যে কত উন্নত, সেটা আমি নিজের জীবনে অনুভব করেছি। আমার সন্তানের জন্মের সময় আমি খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা, কাছাকাছি আত্মীয়স্বজনও কেউ নেই। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা এমনভাবে সব দায়িত্ব নিয়েছিলেন যে, মুহূর্তেই আমার ভয় কেটে গিয়েছিল।
একদিন হঠাৎ জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলো। জরুরি নম্বরে ফোন করার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ডাক্তার, নার্স ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিসহ অ্যাম্বুলেন্স আমাদের বাসায় পৌঁছে যায়। তাদের দক্ষতা, আন্তরিকতা আর মানবিক আচরণ আমাকে সত্যিই বিস্মিত করেছিল।
এখানে ধনী-গরিব, ধর্ম-বর্ণ বা জাতীয়তা দেখে চিকিৎসার মান বদলায় না। সবাই সমান গুরুত্ব পায়। এই বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও অঞ্চলটি সমৃদ্ধ। পাশের শহর নঁসির বিশ্ববিদ্যালয়, বিশেষ করে এর চিকিৎসা শিক্ষা ইউরোপ জুড়ে সুপরিচিত। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসে।




