স্টেনগানের বদলে ফাইলের স্তূপে আরেক যুদ্ধ

হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক শুধু দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, নেতৃত্ব দিয়েছেন স্কাউট আন্দোলনেও। এখন মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় উদ্ধারে। তার জীবনের গল্প শুনেছেন সৈয়দ ফরহাদ
ধানমন্ডি ১৮ নম্বরের অপারেশন শেষ করে ছুটছে একটি গাড়ি। গন্তব্য মতিঝিল। স্টিয়ারিংয়ে হাবিবুল আলম, পাশে বদি (শহীদ বদিউল আলম বীরবিক্রম)। পেছনের সিটে বসে আছেন রুমী (শহীদ শাফি ইমাম রুমী), স্বপন (কামরুল হক স্বপন) ও কাজী (কাজী কামালউদ্দিন বীরবিক্রম)। ঢাকার গেরিলা যুদ্ধের কয়েকজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। একটু আগেই তারা পাকিস্তানি
সেনাদের ওপর সফল হামলা চালিয়েছে। সামনে অপেক্ষা
করছে আরও বিপদ।
ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি ২৫ আগস্ট ১৯৭১। মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে উত্তাল সময়গুলোর একটি। ঢাকা শহরের রাজপথে ছয় তরুণের এই দলটি ছুটে চলেছে জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা মাড়িয়ে। বুকভরা সাহস, হাতে অস্ত্র, আর মনে একটাই সংকল্প— বাংলাদেশকে স্বাধীন করা।
শুনছিলাম মুক্তিযুদ্ধের অবিশ্বাস্য সব গেরিলা অপারেশনের গল্প। বলতে বলতে হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক ফিরে গেলেন অাগস্টের সেই আগুনঝরা দিনগুলোতে।
‘ধানমন্ডি থেকে বেরিয়ে আমরা গাড়ি নিয়ে মিরপুর রোডে উঠে ডান দিকে টার্ন নিলাম। এরপর সোজা সায়েন্স ল্যাবের দিকে এগোলাম। ওখানে পৌঁছাতেই দেখি রাস্তায় অলরেডি চেকপোস্ট বসে গেছে। আর্মির দুইটা ট্রাক নিউ মার্কেটের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো, আরেকটা মিরপুরের দিকে মুখ করা। আমাদের গাড়ির মুখও নিউ মার্কেটের দিকে। সামনে আর্মি দাঁড়িয়ে গেছে। আজকে যেখানে ল্যাবএইড, তার সামনে মাটিতে দেখলাম একজন এলএমজি নিয়ে অলরেডি পজিশন নিয়ে ফেলেছে। রাস্তার আরেক পাশে দাঁড়িয়ে আছে তিন-চারজন। আর রাস্তার ঠিক মাঝখানে একজন সুবেদার হাত তুলে চিৎকার করে বলছে— ‘রোকো, দাঁড়াও, শুয়োর কা বাচ্চা থামো!’
এটুকু বলে থামলেন হাবিবুল আলম। একটু ভাবলেন। স্মৃতির চোরাবালি হাতড়ে হাতড়ে যেন জুড়ে দিচ্ছিলেন গল্পের মালা।
‘আমাদের তো পিছে যাওয়ার উপায় নাই, কারণ পেছনে গাড়ি চলে আসছে। ভেতরে একটা সাংঘাতিক টেনশনের মুহূর্ত। আমার বাঁয়ে বসা বদি একদম চুপচাপ। বললাম, ‘বদি, গেট ইওর গান রেডি। লোড আ নিউ ম্যাগাজিন।’
এরপর কাজীকে বললাম, ‘যে কয়টা পাবেন আপনার বাঁয়ে, সে কয়টাকে মারতে হবে। আদারওয়াইজ উই আর ডেড!’
দেখলাম, রাস্তার মাঝখানে দাঁড়ানো সুবেদারকে ধাক্কা দেওয়া ছাড়া আর উপায় নেই। গাড়িটা সোজা তার দিকে নিয়ে চললাম। তারপর চিৎকার করে বললাম— ‘ফায়ার’
আমাদের গাড়ি থেকে একসঙ্গে তিনটা বন্দুক গর্জে উঠল। বাঁ পাশ দিয়ে দুইটা (বদি আর কাজীর) আর ডান দিক থেকে একটা (স্বপনের)। প্রথম ফায়ারেই মাঝখানে দাঁড়ানো সুবেদারটা মারা পড়ল। যারা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের গায়েও গুলি লাগল। শুয়ে থাকা এলএমজি হাতে আর্মিটা, ওখানেই শেষ।’
আজকে যেখানে ল্যাবএইড, তার সামনে মাটিতে দেখলাম একজন এলএমজি নিয়ে অলরেডি পজিশন নিয়ে ফেলেছে
হলিউডের কোনো অ্যাকশন মুভির গল্প শুনছি না তো!
আমি আর ফটো সাংবাদিক সাজ্জাদ হোসেন একে অন্যের
দিকে তাকাচ্ছিলাম একটু পরপর। অবিশ্বাস্য মনে হলেও মুক্তিযুদ্ধ এমনই।
বয়স তার পঁচাত্তর পেরিয়েছে। এই বয়সে অনেকেই খোঁজেন অবসরের শান্ত বিকাল, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময়
কাটানোর সুযোগ। কিন্তু হাবিবুল আলম বীরপ্রতীকের জীবন
চলে অন্য নিয়মে।
ঢাকার বনানীতে নিজ অফিস কক্ষে বসে, তিনি বলছিলেন তার ব্যস্ততার কথা। ২০২৪ সালের শেষদিকে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হয়েছেন। ১৯৭১ সালের সেই তরুণ গেরিলাটির আজও তাই অবসর মেলেনি। শুধু হাতে স্টেনগানের বদলে এখন আছে ফাইলের স্তূপ, যুদ্ধক্ষেত্রের বদলে আছে ইতিহাসের বিস্তীর্ণ জমিন।
‘আমি ভেবেছিলাম একটু নিঃশ্বাস ফেলব’— কথার মাঝখানে হেসে হেসে বলছিলেন তিনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে আসার পর বুঝলেন আরেক ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে তার।
এই যুদ্ধ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে, এই যুদ্ধ আগামী প্রজন্মের কাছে সত্যিকারের মুক্তিযোদ্ধাদের তুলে ধরার যুদ্ধ।
মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের আড়ালে তার আরেকটি বড় পরিচয়— বাংলাদেশের স্কাউট আন্দোলনের প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন তিনি।
১৯৯০-এর দশকে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের নেতৃত্ব পর্যায়ে কাজ করেছেন। পরে বিশ্ব স্কাউট আন্দোলনের ওয়ার্ল্ড প্রোগ্রাম কমিটির সদস্য হয়েছেন।
একসময় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন। আর আজ লড়ছেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় খুঁজে পেতে।
তার পরিচয়ের কেন্দ্রে রয়েছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, ভাষার প্রতি ভালোবাসা, তরুণদের প্রতি আস্থা কিংবা ইতিহাস রক্ষার দায়— সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতেই যেন এই দেশ। বাংলাদেশ তার কাছে শুধু একটি রাষ্ট্র নয়, বরং তার পরিচয় ও সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশ নিয়ে তার আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে গিয়ে বললেন, ‘তুমি কি মনে করো আমার কাছ থেকে বাংলাদেশ নিয়ে যেতে পারবা? আমি বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ থেকে যাবে।’
কথাটি শুনতে শুনতে মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতার সেই পঙ্ক্তিগুলো—
‘জানি মা গো, তোর হাতে অসম্পূর্ণ সুখ
যা কিছু গড়িয়া দিস ভেঙে ভেঙে যায়
সব-তাতে হাত দেয় মৃত্যু সর্বভুক,
সব আশা মিটাইতে পারিসনে হায়,
তা বলে কি ছেড়ে যাব তোর তপ্ত বুক!’
পঁচাত্তর পেরোনো এই মুক্তিযোদ্ধার জীবন যেন সেই পঙ্ক্তিগুলোরই প্রতিধ্বনি। স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও তিনি থেমে যাননি। একসময় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন দেশের জন্য, আজ লড়ছেন ইতিহাস এবং আগামীর জন্য।




