ডায়েট
কিশোরীর পুষ্টি

মডেল: ডায়না বাড়ৈ। সাজ: শোভন মেকওভার। ছবি: আশরাফুল আলম।
কারও ক্ষেত্রে অপুষ্টি, কারও আবার স্থূলতা— বাংলাদেশের অনেক কিশোরী এমন সমস্যায় আক্রান্ত। সমাধান মিলতে পারে সঠিক খাদ্যাভ্যাসে। লিখেছেন নাহিদ ইসলাম
পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর অনেক কিশোরীর শরীরেই আয়রনের ঘাটতি দেখা দেয়, যা রক্তশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু-কিশোর গ্যাস্ট্রো-লিভার ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. কামাল হোসেন বললেন, হাড়ের মজবুত কাঠামো তৈরির জন্য এই বয়সে শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ সঞ্চয় করা দরকার। এ ছাড়া পেশি গঠন ও উচ্চতা স্বাভাবিকভাবে বাড়ার ক্ষেত্রে প্রোটিন ও জিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেননা বয়ঃসন্ধিকালে শরীর যে পুষ্টি সঞ্চয় করে, তা দিয়েই মূলত একজন নারী তার সারা জীবনের স্বাস্থ্যগত ভিত তৈরি করেন।
কিশোরীদের প্রাত্যহিক খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও ফলমূল থাকা জরুরি। লালশাক বা কচুশাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন থাকে। ছোট মাছে থাকা ক্যালসিয়াম হাড় মজবুত করে এবং ডিম হলো প্রোটিনের খুব ভালো উৎস, যা পেশি গঠনে ভূমিকা রাখে। দুধ ও দই শরীরে ক্যালসিয়ামের পাশাপাশি ভালো ব্যাকটেরিয়া জোগায়, যা হজম প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে সহায়ক।
ন্যাশনাল হেলথ কেয়ার নেটওয়ার্কের নিউট্রিশন অফিসার আকলিমা ফারহানা ঝুমি সতর্ক করে বললেন, ওজন বাড়ার ভয়ে ‘ক্র্যাশ ডায়েট’ করা বা খাওয়া একদম কমিয়ে দেওয়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়। লাল চাল বা লাল আটার রুটির ব্যবস্থা করা না গেলে সাদা চালের ভাত বা সাধারণ আটার রুটি খেয়েও ওজন ঠিক রাখা সম্ভব। এক্ষেত্রে ভাতের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে তার সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ডাল খাওয়া যেতে পারে। ওজন ঠিক রাখতে একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া ভালো। সবজিতে থাকা ফাইবার বা আঁশ সাদা ভাতের শর্করাকে ধীরে ধীরে হজম হতে সাহায্য করে। এর ফলে শরীরে দীর্ঘক্ষণ শক্তি বজায় থাকে এবং বাড়তি মেদ জমার সুযোগ পায় না। দিনে তিনবার প্রধান খাবার এবং দুবার হালকা পুষ্টিকর নাশতা খাওয়া প্রয়োজন। সকালের নাশতায় ভেজানো চিড়ার সঙ্গে টক দই বা দুধ এবং একটি কলা মিশিয়ে খেলে পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে। দুপুর বা রাতের খাবারে ভাতের সঙ্গে একটি সিদ্ধ ডিম অথবা এক টুকরো মুরগির মাংস এবং পর্যাপ্ত ডাল রাখলে শরীরের প্রয়োজনীয় প্রোটিনের চাহিদা খুব সহজেই মিটে যায়। যখনই ভাত বা রুটি খাওয়া হবে, তখন প্লেটের অর্ধেকটা জুড়ে সবজি বা সালাদ রাখলে মূল খাবারের পরিমাণ এমনিতেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
বয়ঃসন্ধিকালে শরীর যে পুষ্টি সঞ্চয় করে, তা দিয়েই মূলত একজন নারী তার সারা জীবনের স্বাস্থ্যগত ভিত তৈরি করে
ডা. কামাল হোসেন সতর্ক করেন, বাইরের খোলা খাবারে হেপাটাইটিস-এ, টাইফয়েড, ডায়রিয়া ও গ্যাস্ট্রিক আলসারের জীবাণু থাকে। পাশাপাশি পুষ্টিবিদ ফারহানার মতে, এসব খাবারে থাকা অতিরিক্ত সোডিয়াম, ট্রান্স ফ্যাট ও রিফাইনড সুগার লিভারে চর্বি জমায় এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। বাইরের জাংক ফুডের প্রতি কিশোরীদের আগ্রহ কমাতে বাড়িতেই মজাদার সব খাবার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। ফাস্ট ফুডের দোকানের মতো করে বাড়িতেই আটার রুটি দিয়ে সবজি আর মুরগির মাংস পেঁচিয়ে রোল বানানো সম্ভব। চটপটির বদলে ঘরে তৈরি সিদ্ধ ছোলার চাট কিংবা ওটস ও ডিমের প্যানকেক খাওয়া যেতে পারে।
মিষ্টিজাতীয় খাবার বা চিনিযুক্ত পানীয় দ্রুত ওজন বাড়ায়। তাই কোল্ড ড্রিংকস এড়িয়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পানের অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। স্বাদ বদলাতে চিনির বদলে অল্প একটু খাঁটি মধু মেশানো লেবুর শরবত, ঘরে পাতা টক দইয়ের লাচ্ছি বা পাকা আমের স্মুদি খাওয়া যেতে পারে। হঠাৎ ক্ষুধা লাগলে যেন ফাস্ট ফুড খেতে না হয়, সেজন্য হাতের কাছে সহজে খাওয়ার মতো ফল, যেমন- আমড়া, বরই, আপেল, নাশপাতি কিংবা শসা ও গাজর রাখা সম্ভব। পুষ্টিবিদ ফারহানা স্ন্যাকিংয়ের জন্য একমুঠো কাঠবাদাম, চীনাবাদাম বা মিষ্টি কুমড়ার বীজ খাওয়ারও পরামর্শ দেন।




