শৈল্পিক পোশাক
হাতে বোনা তাঁতে

মডেল: আফসানা আহমাদ। পোশাক ও গয়না: লেবেল ইমাম হাসান। সাজ: অরা বিউটি লাউঞ্জ। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
হ্যান্ডলুমের আবেদন ফুরায় না; বরং সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নতুন রূপে বিকশিত হয়। এর নান্দনিকতা টেকসই বৈশিষ্ট্য আধুনিক ফ্যাশন নিয়ে লিখেছেন স্বর্ণা রায়
ভোরের আলো হয়তো পুরোপুরি ফোটেনি। গ্রামের উঠোনে রাতের শীতলতা ছুঁয়ে আছে। এরই মধ্যে কাঠের তাঁতে বসে গেছেন একজন তাঁতি। তারই পায়ের ছন্দ, হাতের টান আর মাকুর ওঠানামায় ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে একটি শাড়ি। কয়েক দিন পর সেই শাড়ি হয়তো শহরের কোনো বুটিকের শোকেসে জায়গা পাবে কিংবা কোনো নারীর আলমারিতে। সবাই শাড়ির রঙ, নকশা আর সৌন্দর্যের প্রশংসা করবেন; কিন্তু খুব কম মানুষই ভাববেন, এই সৌন্দর্যের পেছনে কত ঘণ্টার শ্রম, কত বছরের অভিজ্ঞতা আর কত প্রজন্মের উত্তরাধিকার জড়িয়ে আছে। টেক্সটাইল হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ শেখ সাইফুর রহমান বললেন, ‘একটি হ্যান্ডলুম কাপড়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, এতে মানুষের হাতের স্পর্শ থাকে। প্রতিটি বুননে লুকিয়ে থাকে কারিগরের নিজস্ব ছন্দ। তাই কোনো দুটি হ্যান্ডলুম কাপড় কখনো পুরোপুরি একরকম হয় না। এ সামান্য বৈচিত্র্যই এর স্বাতন্ত্র্য।’
দোকানে ঝুলে থাকা একটি হ্যান্ডলুম, অর্থাৎ হাতে বোনা তাঁতে তৈরি পোশাক দেখতে যত সুন্দর ও সহজ মনে হয়, এর জন্মের গল্প ততই দীর্ঘ। শুরুটা হয় সুতা নির্বাচন দিয়ে। এরপর রঙ করা, নকশা তৈরি, তাঁত বসানো, সুতা তোলা, বুনন, ধোয়া, শুকানো, ফিনিশিং— একের পর এক ধাপ পেরিয়ে তৈরি হয় কাপড়। সূক্ষ্ম নকশার জামদানি হলে একটি শাড়ি বুনতেই লেগে যেতে পারে কয়েক সপ্তাহ, কখনো কয়েক মাসও। এই দীর্ঘ সময়, নিখুঁত মনোযোগ এবং দক্ষতার কারণেই হ্যান্ডলুমের মূল্য শুধু কাপড়ের দামে নয়, শ্রমেও নির্ধারিত হয়।
একটি হ্যান্ডলুম কাপড়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, এতে মানুষের হাতের স্পর্শ থাকে। প্রতিটি বুননে লুকিয়ে থাকে কারিগরের নিজস্ব ছন্দ। তাই কোনো দুটি হ্যান্ডলুম কাপড় কখনো পুরোপুরি একরকম হয় না
হ্যান্ডলুমে স্মৃতি
হ্যান্ডলুম শাড়ির সৌন্দর্য শুধু নকশায় নয়, একে বোনার স্মৃতিতেও জড়িয়ে থাকে। অনেক পরিবারের আলমারিতে এমন শাড়ি আছে, যা একসময় মায়ের ছিল, পরে মেয়ের হয়েছে, তারপর হয়তো নাতনির কাছেও পৌঁছাবে। একটি ভালো হ্যান্ডলুম শাড়ি বছরের পর বছর টিকে থাকে আর তার সঙ্গে জমা হয় অসংখ্য গল্প। প্রথম চাকরির দিন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন, পহেলা বৈশাখের সকাল, ঈদের আনন্দ, দুর্গাপূজার অঞ্জলি কিংবা প্রিয়জনের বিয়ে— জীবনের বিশেষ দিনগুলোর সঙ্গী হয়ে ওঠে একটি তাঁতের শাড়ি। এ শুধু পোশাক নয়, সময়েরও সাক্ষী। একটি তাঁতের শব্দ শুধু সুতা জোড়া দেয় না; জুড়ে দেয় ইতিহাস, মানুষের শ্রম, ভালোবাসা আর একটি দেশের পরিচয়। ভোরের আলো ফুটতেই কোনো গ্রামের উঠোনে যখন তাল মিলিয়ে ওঠে তাঁতের খটখট শব্দ, তখন হয়তো আরেকটি জামদানি, আরেকটি খাদি কিংবা আরেকটি নকশার গল্প জন্ম নেয়।
পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন হাউজগুলো বলছে, এ সময়ে ফাস্ট ফ্যাশন নয়, প্রয়োজন স্লো ফ্যাশন। এমন পোশাক, যা প্রকৃতির ক্ষতি কমায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এবং যার পেছনে থাকে মানুষের হাতের স্পর্শ। আশ্চর্যের বিষয়, এ দর্শন নতুন হলেও এর উত্তর বহু আগেই লুকিয়ে ছিল বাংলার হ্যান্ডলুমে। একজন নারী যখন একটি হ্যান্ডলুম শাড়ি, কুর্তি, টপ-প্যান্ট বা ফ্রক পরে আয়নার সামনে দাঁড়ান, তখন সেটি পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে শতবছরের ঐতিহ্য, একজন তাঁতির শ্রম, একটি গ্রামের গল্প এবং এক টুকরো বাংলাদেশ হয়ে ওঠে।
হাজার বছরের বয়নশিল্প
আমাদের দেশের হ্যান্ডলুম শিল্পের ইতিহাস কয়েক শতকের নয়; প্রায় পাঁচ হাজার বছরের। শেখ সাইফুর রহমান জানিয়েছেন, বিশ্বের বহু সভ্যতা যখন বস্ত্র তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে, তখন বাংলার মানুষ তুলা চাষ, সুতা কাটা এবং সূক্ষ্ম কাপড় বোনার অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিল। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডে উৎপাদিত তুলা থেকেই তৈরি হতো নানা ধরনের কাপড়। সেই ধারার সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় মসলিন। বাংলার মসলিন মিসরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয়েছিল, রাজপ্রাসাদ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পেয়েছিল বিশেষ মর্যাদা। আজ মসলিন আগের জায়গায় নেই, কিন্তু তাঁতের শব্দ এখনো থেমে যায়নি। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কুমিল্লা কিংবা জামালপুর— বাংলাদেশের নানা প্রান্তে এখনো অসংখ্য পরিবার এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
এ সময়ে ফাস্ট ফ্যাশন নয়, প্রয়োজন এমন পোশাক, যা প্রকৃতির ক্ষতি কমায়, দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় এবং যার পেছনে থাকে মানুষের হাতের স্পর্শ
তাঁতের সৌন্দর্য
একটি হ্যান্ডলুম পোশাক দোকানের শেলফে ওঠার আগে কত হাতের স্পর্শ পেরিয়ে আসে, তা নিয়ে আমরা হয়তো কমই ভাবি। প্রতিটি বুননে থাকে সামান্য বৈচিত্র্য, যা মেশিন কখনো তৈরি করতে পারে না। এই ছোট ছোট অসমতাই এর আসল সৌন্দর্য। ফ্যাশন পাল্টায়, ট্রেন্ড বদলায়, কিন্তু একটি সুন্দর তাঁতের কাপড়ের আবেদন কখনো পুরনো হয় না। টাঙ্গাইল তাঁত, নরম খাদি, মসলিন কিংবা রঙিন জামদানি— হ্যান্ডলুমের প্রতিটি পোশাকের নিজস্বতা রয়েছে। অফিস, উৎসব, বইমেলা, নববর্ষ, বিয়ে কিংবা সন্ধ্যার কোনো আয়োজন- সবখানেই হ্যান্ডলুম শাড়ি কিংবা এর যেকোনো পোশাক নারীর সৌন্দর্যকে করে তোলে স্বতন্ত্র। এ ধরনের কাপড়ের ভাঁজ, প্রাকৃতিক টেক্সচার এবং কোমল ভাব আলাদা আভিজাত্য তৈরি করে। ভারী অলংকার ছাড়াও একটি হ্যান্ডলুম শাড়ি অনায়াসেই হয়ে উঠতে পারে পুরো সাজের মূল আকর্ষণ।
স্লো ফ্যাশনের নতুন ধারা
আজকের পৃথিবীতে ফাস্ট ফ্যাশনের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো অতিরিক্ত উৎপাদন এবং অপচয়। প্রতি মৌসুমে নতুন পোশাক, কম দাম, দ্রুত ব্যবহার এবং অল্পদিনেই ফেলে দেওয়ার সংস্কৃতি পরিবেশের ওপর বড় চাপ তৈরি করছে। বিপরীতে স্লো ফ্যাশন বলছে— মানে ভালো এবং পরিমাণে কম পণ্য কিনুন, দীর্ঘদিন ব্যবহার করুন। এ জায়গাতেই হ্যান্ডলুম সবচেয়ে এগিয়ে। কারণ এমন তাঁতবস্ত্র তৈরিতে বিদ্যুৎনির্ভর বিশাল কারখানার প্রয়োজন পড়ে না; কার্বন নিঃসরণও তুলনামূলকভাবে কম হয়। একটি ভালো হ্যান্ডলুম পোশাক বছরের পর বছর ব্যবহার করা যায়। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ভোক্তা সংস্কৃতিকেও উৎসাহিত করে।
বিশ্ব ফিরছে হাতে বোনা তাঁতে
একসময় দ্রুত উৎপাদনই ছিল ফ্যাশন শিল্পের সাফল্যের মাপকাঠি। সেই ধারণা বদলাচ্ছে। বিশ্ব জুড়ে মানুষ আবার হাতে তৈরি পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। কারণ তারা বুঝতে শুরু করেছে, একটি পোশাকের মূল্য শুধু এর ব্র্যান্ডে নয়, গল্পেও। যে পোশাকের পেছনে একজন মানুষের শ্রম, একটি গ্রামের ইতিহাস, একটি সংস্কৃতির পরিচয় এবং প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকে, সেই পোশাকই সত্যিকারের বিলাসিতা। তাই হ্যান্ডলুম এখন ঐতিহ্য তো বটেই; ভবিষ্যৎ ফ্যাশনেরও অনন্য মাত্রা। যেমন- একসময় মানুষ কম পোশাক কিনত, কিন্তু যত্ন করে ব্যবহার করত। একটি শাড়ি বছরের পর বছর থাকত, প্রজন্ম পেরিয়ে যেত। আধুনিক ভাষায় এ জীবনদর্শনই স্লো ফ্যাশন। অদ্ভুত হলেও সত্যি, যাকে আজ পৃথিবী নতুন ধারণা হিসেবে গ্রহণ করছে, বাংলার তাঁতশিল্প সেই দর্শন বহু শতাব্দী ধরে ধারণ করে এসেছে। তাই ভবিষ্যতের ফ্যাশন হয়তো প্রযুক্তিনির্ভর হবে; কিন্তু তার আত্মা থেকে যাবে মানুষের হাতে টানা তাঁতের খটখট শব্দে, সুতার বুননে আর বাংলার চিরন্তন হ্যান্ডলুমে।
আধুনিক ফ্যাশনে পিছিয়ে কেন
বাংলাদেশে এখনো হ্যান্ডলুমের সবচেয়ে বড় বাজার চলছে শাড়িকে ঘিরে। কিন্তু জ্যাকেট, ট্রাউজার, কোট, শার্ট, কো-অর্ড সেট কিংবা সমসাময়িক ওয়েস্টার্ন পোশাকে এর ব্যবহার খুব সীমিত। শেখ সাইফুর রহমান মনে করেন, এর প্রধান কারণ গবেষণা, বিনিয়োগ এবং টেক্সটাইল উদ্ভাবনের অভাব। অনেক দেশ তাদের ঐতিহ্যবাহী কাপড়কে আধুনিক নকশার সঙ্গে মিলিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সফল হয়েছে। বাংলাদেশেও সেই সুযোগ রয়েছে, তবে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। বর্তমানে ফিউশন ফ্যাশনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। তবে ফিউশন মানে ইচ্ছেমতো বিভিন্ন কাপড়কে জোড়া দেওয়া নয়। প্রতিটি কাপড়ের আলাদা বুনন, ঘনত্ব, ওজন ও ব্যবহারিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই হ্যান্ডলুম, খাদি, সিল্ক কিংবা পাওয়ারলুম— সবকিছুকে না বুঝে একসঙ্গে ব্যবহার করলে পোশাকের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। সফল ফিউশনের জন্য প্রয়োজন কাপড় সম্পর্কে গভীর জ্ঞান এবং দক্ষ নকশার চিন্তা।
হ্যান্ডলুম নাকি পাওয়ারলুম
বর্তমান বাজারে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তির জায়গা এখানেই। অনেক সময় মেশিনে তৈরি কাপড়ও হ্যান্ডলুম বা খাদি পরিচয়ে বিক্রি করা হয়। আসল হ্যান্ডলুমে বুননের স্বাভাবিক বৈচিত্র্য, সুতার ছোটখাটো অসমতা এবং হাতে তৈরি হওয়ার স্বাক্ষর থাকে। অন্যদিকে পাওয়ারলুমের কাপড় তুলনামূলকভাবে একেবারে সমান ও নিখুঁত। জামদানির ক্ষেত্রেও এ বিভ্রান্তি দেখা যায়। তাই শুধু কাউন্ট শুনে নয়, বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে হ্যান্ডলুম পোশাক কেনা সবচেয়ে নিরাপদ।




