লোডশেডিংয়ের সুযোগে ঘরে ঢুকে তিনজনকে কোপাল দুর্বৃত্তরা

ভুক্তভোগী মঞ্জুর মিয়ার বাড়িতে পুলিশ ও স্থানীয়দের ভিড়— সংগৃহীত
রাত তখন প্রায় ৩টা। চলছে লোডশেডিং। চারপাশ অন্ধকারে ঢাকা। নগরভেলা গায়েনবাড়ি এলাকার অধিকাংশ মানুষ তখন গভীর ঘুমে।
হঠাৎ একটি বাড়ি থেকে ভেসে আসে চিৎকার। ঘুম ভেঙে যায় আশপাশের বাসিন্দাদের। বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করতেই অন্ধকারে থাকা একদল লোকের হুমকি-বাইরে এলে গুলি করব।
এরই মধ্যে একটি বাড়ির ভেতরে চলছিল ভয়াবহ হামলা।
গাজীপুরের কালীগঞ্জের নাগরী ইউনিয়নের ওই বাড়িটি রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী মঞ্জুর মিয়ার। অভিযোগ, ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল বাড়িতে ঢুকে মঞ্জুর মিয়া, তার স্ত্রী কামরুন নাহার (৩৫) ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমের (১৬) ওপর ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়।
আজ শনিবার ভোররাতে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় গুরুতর আহত তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। তার স্বামী মঞ্জুর মিয়া (৪১) ও মেয়ে সানজিদা আক্তার মিম গুরুতর আহত অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বৃষ্টির মধ্যেই মুখে গামছা পেঁচানো ও হাফপ্যান্ট পরা কয়েকজনকে এলাকায় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। পরে তারা আশপাশের বাড়ির লোকজনকে বাইরে বের হতে বাধা দেয়।
মঞ্জুর মিয়ার বাড়িতে ঢোকার জন্য মূল পথ ব্যবহার না করে তারা ভেঙে ফেলে টয়লেটের ভেন্টিলেটর। সেই পথ দিয়েই ঘরের ভেতরে ঢুকে দুর্বৃত্তরা।
চাপাতি ও ছুরি দিয়ে মঞ্জুর মিয়া, কামরুন নাহার এবং তাদের মেয়ে মিমকে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। আহতদের চিৎকারে আশপাশের মানুষ জড়ো হতে শুরু করলে হামলাকারীরা গুলি করার হুমকি দেয়। বাইরে থাকা লোকজনকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ইট-পাটকেলও।
একপর্যায়ে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকলে হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল ছেড়ে পালিয়ে যায়।
ঘটনার শব্দ শুনে টর্চ হাতে বাড়ির বাইরে বের হয়েছিলেন মঞ্জুর মিয়ার চাচা সত্তরোর্ধ্ব নাছির ব্যাপারী।
তিনি জানান, তখন কারেন্ট ছিল না। বাইরে বের হওয়ার পর একজন দুর্বৃত্ত তাকে দ্রুত ঘরে ঢুকে যেতে বলে। বাইরে থাকলে গুলি করার হুমকি দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পর হামলাকারীদের ছোড়া একটি ইট এসে তার ডান পায়ে লাগে।
পরে আশপাশের লোকজনের ডাকাডাকি বাড়তে থাকলে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর স্বজন ও স্থানীয়রা আহত মঞ্জুর মিয়া, তার স্ত্রী কামরুন নাহার এবং মেয়ে মিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত মঞ্জুর মিয়াকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। মেয়ে সানজিদা আক্তার মিমকেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
মঞ্জুর মিয়ার বড় ভাইয়ের স্ত্রী ষাটোর্ধ্ব আসমা বেগম বললেন, ‘রাত ৩টার দিকে দেবরের বাড়িতে ডাকাতির খবর পান। পরে তার স্বামী ও ছেলে ঘটনাস্থলে গিয়ে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেই কামরুন নাহারের মৃত্যু হয়।’
মঞ্জুর মিয়ার ভাই মোহন মিয়া বলেছেন, ‘হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক কামরুন নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে মঞ্জুর মিয়া ও তার মেয়ে মিমকে ঢাকায় পাঠানো হয়।’
তার ধারণা, ডাকাতির উদ্দেশ্যেই হামলাটি হয়ে থাকতে পারে।
মোহন মিয়া জানান, একটি প্লট কেনার জন্য একটি সমিতি থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলনের কথা ছিল। ওই টাকা উত্তোলন করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে টাকা উত্তোলনের বিষয়টি দুর্বৃত্তরা জেনে থাকতে পারে বলে তাদের ধারণা।
কালীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, দুর্বৃত্তরা বাড়িতে ঢুকে মঞ্জুর মিয়া, তার স্ত্রী ও মেয়েকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কামরুন নাহার মারা যান।
তিনি জানান, মঞ্জুর মিয়া ঢাকার একটি হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেছেন, ‘বাড়ি থেকে কোনো অর্থ বা মালামাল লুট হওয়ার তথ্য এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ঘটনাটি অত্যন্ত নৃশংস। ঘটনার পর গাজীপুরের পুলিশ সুপার, জেলা পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, পিবিআই, ডিবি, সিআইডি ও কালীগঞ্জ থানা পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।’ ঘটনার পেছনে কী কারণ রয়েছে এবং কারা এ হামলায় জড়িত তা বের করতে তদন্ত চলছে বলে জানান তিনি।
এদিকে নিহত কামরুন নাহারের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক দল কাজ করছে।








