বিশ্লেষণ
কিমকে কাছে টেনে সিউলকে চাপ, ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারার’ চেষ্টায় ট্রাম্প?

ছবি: রয়টার্স
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ওয়াশিংটনকে সহায়তা না করায় ঘনিষ্ঠ মিত্র দক্ষিণ কোরিয়াকে তিরস্কার করেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে তার প্রথম মেয়াদ থেকেই চলা অন্যতম বিতর্কিত কূটনৈতিক ইস্যুটি আবারও সামনে এসেছে।
ট্রাম্প সোমবার বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম সম্প্রতি তার দেওয়া প্রস্তাবের জবাবে ‘খুবই ইতিবাচক’ সাড়া দিয়েছেন। এর এক দিন আগে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়া কমিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য এসব মহড়া পরিচালনা করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, প্রথম মেয়াদে তিনবার কিমের সঙ্গে বৈঠক করা এবং তার সঙ্গে সম্পর্কের কারণে কোরীয় উপদ্বীপ এখন ‘অনেক বেশি নিরাপদ’। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল মঙ্গলবার জানিয়েছে, আগামী শরতেই কিমের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করতে সহযোগীদের চাপ দিচ্ছেন ট্রাম্প। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এ বৈঠক হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈঠকের ফল যা-ই হোক, কিমের সঙ্গে একটি শীর্ষ বৈঠক ট্রাম্পের জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ইরানে ওয়াশিংটনের অজনপ্রিয় যুদ্ধের সমাধান হয়নি এবং ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও এখনও পূরণ হয়নি।
তবে কিমের সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হওয়ার প্রচেষ্টার আরেকটি কারণ হতে পারে দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করা। এটি কূটনীতিতে ট্রাম্পের লেনদেনভিত্তিক বা ‘ট্রানজ্যাকশনাল’ পদ্ধতির একটি উদাহরণ।
ওয়াশিংটনের হেনরি জ্যাকসন স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সেন্টার ফর কোরিয়ান স্টাডিজের পরিচালক ইয়ং-চুল হা আলজাজিরাকে বললেন, ‘ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করতে [সিউলের] অনীহা এবং যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগে ধীরগতির পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইতে পারেন।’
তিনি যোগ করেন, ‘দুই দেশের চলমান জোট থাকা সত্ত্বেও এটিকে পাল্টা-পদক্ষেপের কূটনীতি হিসেবে দেখা যেতে পারে।’
ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্ক কীভাবে বদলেছে?
২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরে স্থাপনযোগ্য ছোট আকারের পারমাণবিক ওয়ারহেড তৈরি করার খবরের পর ট্রাম্প পিয়ংইয়ংকে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দিয়েছিলেন।
২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে কিমের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রথম মুখোমুখি বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সেখানে তারা কোরীয় উপদ্বীপের ‘সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে’ সম্মত হন। কিন্তু ২০১৯ সালে হ্যানয় এবং কোরীয় অসামরিকীকৃত অঞ্চল বা ডিএমজেডে পরবর্তী বৈঠকগুলো ওই প্রাথমিক সমঝোতাকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়। যদিও এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ডে পা রাখা প্রথম এবং একমাত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট হন।
এরপর উত্তর কোরিয়া তার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতা বাড়িয়েছে, নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে এবং রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প বলেছেন, কিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক ‘হুমকিমুক্ত ও সম্মানজনক’।
ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও ইয়ং-চুল হা বলেছেন, ট্রাম্প হয়তো মনে করেন, হ্যানয় বৈঠক ব্যর্থ হয়েছিল সমালোচকদের চাপের কারণে। তাদের মধ্যে ছিলেন তাচর সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন, যিনি মার্কিন সরকারকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের জন্য চাপ দিতে অথবা পিয়ংইয়ংয়ে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বলেছিলেন।
হা বললেন, ‘ট্রাম্প হয়তো এখন মনে করছেন, এবার এ ধরনের বাধা না থাকলে তিনি কিমের সঙ্গে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে পারবেন।’
ট্রাম্প মিত্র দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করবেন কেন?
ট্রুথ সোশ্যালে রবিবার রাতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। তিনি আকস্মিকভাবে ঘোষণা দেন, সিউলের সঙ্গে ‘অনুপযুক্ত ও শত্রুতামূলক’ সামরিক মহড়া কমিয়ে দিতে তিনি পেন্টাগনকে নির্দেশ দিয়েছেন।
পরে তিনি সিদ্ধান্তটির সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তা না করার বিষয়টি যুক্ত করেন।
ওভাল অফিসে ট্রাম্প বললেন, ‘আমরা সব দেশকে ঘুরে ঘুরে রক্ষা করতে পারি না, বিশেষ করে যখন তারা আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না।’
১১ দিনব্যাপী ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ মহড়ার উদ্দেশ্য উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া। উত্তর কোরিয়া এসব মহড়াকে নিজেদের ওপর হামলার মহড়া হিসেবে দেখে। কোরীয় যুদ্ধের (১৯৫০-৫৩) পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা জোরদারে দেশটিতে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। ওই যুদ্ধ শান্তিচুক্তির পরিবর্তে একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে শেষ হয়েছিল।
এই মহড়া কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সিউলের জন্য নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। কারণ উত্তর কোরিয়াকে ঠেকাতে দক্ষিণ কোরিয়া ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নেভাদার পূর্ব এশিয়ার ইতিহাসবিদ ইউজিন পার্কের মতে, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত কৌশলগত অগ্রাধিকারকে প্রতিফলিত করছে।
তিনি আলজাজিরাকে বললেন, ‘ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সম্পদের ওপর বেশি চাপের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দায়বদ্ধতা এবং সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতা নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগও রয়েছে।’
পার্কের মতে, ইরানকে ঘিরে সংঘাত কোরীয় উপদ্বীপের কূটনীতি যে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবেশে পরিচালিত হয়, সেটিও বদলে দিয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আরেকটি বড় সংকট তৈরি হওয়া এড়ানোর জন্য ওয়াশিংটনের শক্তিশালী প্রণোদনা রয়েছে।
অর্থও কি বড় কারণ?
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকতে পারে।
স্টিমসন সেন্টারের কোরিয়া প্রোগ্রাম ও ৩৮ নর্থের জ্যেষ্ঠ ফেলো র্যাচেল মিনইয়ং লি বলেছেন, ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক মহড়াকে চাপ হিসেবে ব্যবহার করে ‘দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগ দ্রুততর করতে এবং সম্ভবত দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যয় ভাগাভাগি বাড়ানোর ভিত্তি তৈরি করতে’ পারেন।
ট্রাম্প চান, দুই দেশের জোট আরও ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাক, যেখানে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সিউলকে আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। প্রথম মেয়াদে দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা মোতায়েনের খরচ বহনে সিউলের অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন তিনি। তার যুক্তি ছিল, দক্ষিণ কোরিয়া খুব কম অর্থ দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক উত্তেজনাও এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন লি।
ট্রাম্পের প্রথম প্রশাসন দুই দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পুনরায় আলোচনা করেছিল এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ইস্পাতের ওপর শুল্ক আরোপ করেছিল। ওয়াশিংটন প্রথমে ২৫ শতাংশ শুল্কের হুমকি দিলেও পরে দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। এসব প্রতিশ্রুতির মধ্যে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানির জন্য অনুকূল বিধিমালাও ছিল।
পরে চুক্তি বাস্তবায়নে সিউল ধীরগতিতে এগোচ্ছে অভিযোগ করে ট্রাম্প আবারও বেশি শুল্ক আরোপের হুমকি দেন।
মিনইয়ং লি বললেন, ‘শুল্ক ১৫ শতাংশে রাখার শর্ত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না আসা ট্রাম্পের জন্য বড় ধরনের হতাশার কারণ বলে মনে হচ্ছে।’
যুক্তরাষ্ট্র-উত্তর কোরিয়া সম্পর্কে কি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে?
অন্তত এখনই নয়। মিনইয়ং লির মতে, উত্তর কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করে না। এর পাশাপাশি ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান হামলার পর থেকে পিয়ংইয়ং ধারাবাহিকভাবে ওয়াশিংটনকে ‘অবিশ্বস্ত পক্ষ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য অস্থিতিশীলতাকারী’ হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।
চলতি বছরের শুরুতে কিম স্পষ্ট করেছিলেন, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পূর্বশর্ত হলো ওয়াশিংটনকে উত্তর কোরিয়ার ‘সাংবিধানিক অবস্থান’ স্বীকার করতে হবে—যার অর্থ দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হিসেবে অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া।
মিনইয়ং লি বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবারও কিম জং উনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে যতই আগ্রহী হন না কেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়া তার জন্যও খুব কঠিন বিষয় বলে মনে হচ্ছে।’
সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকের মতে, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়া কমিয়ে ট্রাম্প ‘এক ঢিলে দুই পাখি মারার’ চেষ্টা করছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর প্রভাব খাটানো এবং কিমসহ বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া যে, তিনি এখনও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ স্থাপনে আগ্রহী।









