উত্থানের পর অস্বস্তির বৃত্তে জামায়াত
- অনুদান-ত্রাণে স্বজনপ্রীতি ক্ষমতার প্রভাব, নৈতিক স্খলন— একের পর এক অভিযোগ
- জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিতে সতর্কবার্তা, কঠোর নির্দেশনা

অনুদান-ত্রাণের অভিযোগের বাইরে জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে নৈতিকতার প্রশ্ন। ছবি : সংগৃহীত
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীনতা, শৃঙ্খলা ও ইনসাফ— দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এসব শব্দই এখন নতুন পরীক্ষার মুখে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৮টি সাধারণ ও ৯টি সংরক্ষিত নারী আসনে জয় নিয়ে দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর দলটির জনপ্রতিনিধিদের ঘিরে একের পর এক অভিযোগ সামনে আসছে। সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বণ্টন থেকে শুরু করে স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার প্রভাব এবং ব্যক্তিগত আচরণ— বিভিন্ন ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে দলটির এমপি ও স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে।
ক্ষমতার বাইরে থেকে অন্যদের অনিয়ম-দুর্নীতির সমালোচনা করা জামায়াত এখন সেই একই মানদণ্ডে নিজেদের জনপ্রতিনিধিদেরও বিচার করতে বাধ্য হচ্ছে। কোনো ঘটনায় ব্যাখ্যা, কোনো ঘটনায় ব্যক্তিগত সহকারীকে অব্যাহতি, আবার কোনো ঘটনায় সরাসরি সাংগঠনিক শাস্তি— সব মিলিয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জনের পর জামায়াতের সামনে এখন দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে সংসদে প্রধান বিরোধী দলের দায়িত্ব, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ‘নৈতিক’ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ধরে রাখা।
একটির পর একটি বিতর্ক: নির্বাচনের কয়েক মাস না যেতেই দলটির কয়েকজন এমপি ও স্থানীয় নেতাকে ঘিরে অভিযোগ সামনে এসেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদান এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে।
নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় তার মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেখানোর অভিযোগ ওঠে। একই সঙ্গে নিজের ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার মানুষের আধিক্য নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়। এমপি দাবি করেন, তার অগ্রিম স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী তালিকা তৈরি করেছিলেন। পরে ব্যক্তিগত সহকারীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন তিনি।
এর আগে রংপুরের পীরগঞ্জ-৬ আসনের এমপি মো. নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনকে সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। খুলনা-৬ আসনের এমপি আবুল কালামের বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
গণমাধ্যমে এসব অভিযোগ প্রকাশের পর বিষয়গুলো পর্যবেক্ষণে নেয় জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। পরিস্থিতি সামাল দিতে সব সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত নির্দেশনা পাঠিয়েছে জামায়াত। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে পাঠানো ওই নির্দেশনায় সরকারি অনুদান, ত্রাণ কিংবা আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী, ব্যক্তিগত সচিব কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দলীয় সূত্র বলছে, প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত আচরণও এখন দলের রাজনৈতিক ভাবমূর্তির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হচ্ছে। তাই অভিযোগ উঠলে তা এড়িয়ে না গিয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নীতি নিয়েছে কেন্দ্র।
অনুদান-ত্রাণের অভিযোগের বাইরে জামায়াতের জন্য সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে নৈতিকতার প্রশ্ন। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরেই মূলত সৃষ্টি হয় এ প্রশ্ন। বিতর্কের সূত্রপাত গত জুলাইয়ে। তার সঙ্গে এক নারীর ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। প্রথমদিকে জামায়াতের নেতাকর্মীদের একটি অংশ ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বলে দাবি করেন। পরে গাজী নজরুল নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ভিডিওতে থাকা নারীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন বলে দাবি করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই ১৭ জুন মরিয়মকে বিয়ে করেছেন। তবে বিষয়টি সেখানেই থেমে থাকেনি। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ঘটনাটি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যেই জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সাংগঠনিক তদন্তে গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে জানানো হয়। ২২ জুলাই তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জামায়াত। একই সঙ্গে বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে জানানো এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি।
ঘটনাটি জামায়াতের দীর্ঘদিনের নৈতিক ভাবমূর্তির সামনে বড় প্রশ্ন সৃষ্টি করে। দলটির নেতারা অবশ্য বলছেন, নৈতিকতার প্রশ্নে তাদের অবস্থান বরাবরই কঠোর এবং অপরাধ বা অন্যায়ের ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হয় না। শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও শেরপুর-১ আসনের এমপি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেছেন, ‘অপরাধ ও অন্যায়ের প্রশ্নে জামায়াত কাউকে ছাড় দেয় না।’
সংসদে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আব্দুল মুনতাকিমও। বাজেট বক্তৃতায় নিজের বাবাকে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করার পর তার নির্বাচনী হলফনামায় মা-বাবা দুজনই জীবিত থাকার তথ্য সামনে আসে। পরে তিনি বক্তব্যটি ভুল বা অসাবধানতাবশত হয়েছে বলে দুঃখপ্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম-১৫ আসনের এমপি শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. আরমান উদ্দিনকে ঘিরেও এলাকায় ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারসহ নানা অভিযোগ আলোচনায় এসেছে। স্থানীয়ভাবে তাকে ‘আরমান এমপি’ নামে ডাকার বিষয়টিও আলোচিত হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মিজানুর রহমান সংসদ সদস্যদের সরকারি বাসভবনের জন্য ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও পর্দার দাবি তুলে সমালোচনার মুখে পড়েন।
শুধু এমপিদের কর্মকাণ্ড নয়, স্থানীয় পর্যায়েও সরকারি সুবিধা ও বরাদ্দ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে জামায়াতকে। ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলা জামায়াতের আমির মাওলানা তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল প্রকৃত উপকারভোগীর বদলে নিজের নাতনিকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বাইসাইকেলটি ফেরত দিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং তাকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। মুন্সীগঞ্জে নৈতিক স্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দুই রুকনের সদস্যপদ বাতিল এবং রাজধানীর ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় চার নেতাকর্মীকে বহিষ্কারও করেছে দলটি।
সতর্কবার্তা, কঠোর নির্দেশনা: জামায়াতের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে জনপ্রতিনিধিদের আচরণ ও জবাবদিহি। দলটির আমির সম্প্রতি রুকন সম্মেলনে নেতাকর্মীদের সতর্ক করে বলেছেন, নিজেদের ‘সাদা কাপড়’ হিসেবে উপস্থাপন করলে আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে। নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন। সহনীয় মাত্রার ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ থাকলেও গুরুতর লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠিন সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ার করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জামায়াতের এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, ‘প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অন্য দলের ক্ষেত্রে যেটি ছোট ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়, আমাদের ক্ষেত্রে সেটিই বড় বিতর্কে পরিণত হয়। কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত হয়েছি। বিশেষ করে গাজী নজরুলের ঘটনাটি দলের জন্য বড় ইমেজ সংকট সৃষ্টি করেছে। তবে এসব থেকে শিক্ষা নিয়েই আমরা কঠোর হচ্ছি।’ জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেছেন, ভবিষ্যতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা বিতর্ক এড়াতে এরই মধ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘দল বা ব্যক্তি হিসেবে ভুল হতে পারে। তবে সে ভুল নিয়ে আমরা বসে থাকিনি। যেখানে যা প্রয়োজন আমরা সেরকম ব্যবস্থা নিয়েছি। এক্ষেত্রে জাতীয় সংসদের সদস্যকেও আমরা ছাড় দিইনি।’
জামায়াতের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণে: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আইনুল ইসলামের মতে, জামায়াত প্রথমবারের মতো বড় সংসদীয় শক্তি হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন জনপর্যবেক্ষণে। আগে যে বিষয়গুলো খুব একটা আলোচনায় আসত না, এখন সেগুলোও জাতীয় বিতর্কে পরিণত হচ্ছে। এ চাপ সামলাতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, রাজনৈতিক পরিপক্বতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা— সবকিছুরই পরীক্ষা দিতে হচ্ছে দলটিকে।




