বন্ধ হচ্ছে পদ্মা ব্যাংক
- অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদে উঠছে অবসায়ন প্রস্তাব
- মোট সম্পদ ৭০০০ কোটি টাকা
- সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানত ৩২০০ কোটি টাকা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
১০ বছর ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে পদ্মা ব্যাংক পিএলসি (সাবেক ফার্মারস ব্যাংক)। সে সময় থেকেই তারল্য সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যাংকটি। বছরের পর বছর নানা পদক্ষেপের পরও কোনো উন্নতি হয়নি; বরং উদ্যোক্তারা নামে-বেনামে ঢালাওভাবে ঋণ নিয়েছেন। মানা হয়নি ন্যূনতম বিধিবিধান, হয়েছে রীতিমতো লুটপাট।
এমন নাজুক পরিস্থিতি থেকে উদ্ধারে সাত বছর আগে ব্যাংকটির নাম পরিবর্তন করে দেওয়া হয় পদ্মা। তৎকালীন সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান সেখানে নতুন করে বিনিয়োগ করেছিল প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা। এতেও আসেনি কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন। কারণ ফের অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে প্রায় পুরো টাকা লোপাট করা হয়েছে। এতে খেলাপি ঋণের অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৯০ শতাংশের বেশি খেলাপি। স্থবির হয়ে পড়েছে সার্বিক কার্যক্রম।
এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকটি বন্ধ (অবসায়ন) করে দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
পদ্মা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র আরও জানাচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ বৈঠক করেছে। সেখানে সার্বিক বিষয়ে আলোচনা করা হয়। কিন্তু ব্যাংকটি সক্রিয় করতে কোনো সমাধানের পথ বের করা সম্ভব হয়নি। তখন পদ্মা ব্যাংকের সংকট কাটাতে অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সেটি অনুমোদনের জন্য চলতি মাসেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদে উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পাওয়া গেলে ব্যাংকিং রেজল্যুশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু হবে ব্যাংক বন্ধের কার্যক্রম। আর যদি এমন সিদ্ধান্ত হয়, সেটি হবে দেশের ইতিহাসে প্রথম কোনো ব্যাংক অবসায়নের ঘটনা। বিধান অনুযায়ী এই ব্যাংকের একজন ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহক বীমা আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ফেরত পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বৃহস্পতিবার আগামীর সময়কে বলেছেন, ব্যাংকের বর্তমান যে নাজুক পরিস্থিতি, তাতে কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যাংক স্বেচ্ছায় পদ্মা ব্যাংকের দায়িত্ব বা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইবে না। ব্যাংকটির মন্দ ঋণ, পুঞ্জীভূত লোকসান এবং মূলধন ঘাটতি এতটাই বেশি যে, তা কাটিয়ে ওঠা সাধারণ প্রক্রিয়ায় অসম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে পদ্মা ব্যাংককে টিকিয়ে রাখা বা কোনো ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা অত্যন্ত কঠিন। সবকিছু মিলিয়ে গুটিয়ে ফেলা (অবসান বা লিকুইডেশন) ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
ওই বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে গতকাল শনিবার আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারা, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং তারল্য সংকটে থাকা পদ্মা ব্যাংক অবসায়ন করতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তার আগে ব্যাংকের পরিস্থিতি উন্নতির লক্ষ্যে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল; কিন্তু সংকট কাটেনি। তারল্য ব্যবস্থাপনায় কোনো উন্নতি করতে পারেনি ব্যাংকটি। এমনকি উত্তরণের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনাও দেখাতে পারেনি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। শুধু ব্যাংকের পক্ষ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা সহায়তা চাওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক প্রত্যাখ্যান করেছে। এমন বাস্তবতায় ব্যাংকটিকে আগের অবস্থায় না রেখে অবসায়ন করতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, পদ্মা ব্যাংক একটি ‘বিষফোড়া’। এর দায় আর কত টানা যায়। সবকিছু বিবেচনায় বর্তমান অবস্থায় ব্যাংকটি রাখা হবে না। বন্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। কারণ কোনো ব্যাংকই পদ্মার সঙ্গে একীভূত হতে চায় না। আগে ব্যাংকটিকে এক্সিম এবং সোনালী ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল; কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, পদ্মা ব্যাংকের সম্পদ প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা। আর গত জুন পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ৫৩৮ কোটি। তার মধ্যে ৪ হাজার ৯৩৩ কোটি খেলাপি হয়েছে, যা শতকরা হিসাবে ৯০ শতাংশ। আগের বছর (২০২৬) জুনে খেলাপি ছিল ৫ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা ঋণের প্রায় ৯১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মূলত ঋণ পুনঃ তফসিল এবং এক্সিট কর্মসূচির আওতায় কিছু টাকা আদায় করেছে ব্যাংকটি। সে সঙ্গে খেলাপির পরিমাণও কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে জানা গেছে, পদ্মা ব্যাংকের জুনে ছিল প্রায় ৬ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকার সম্পদ। যার বড় একটি অংশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। পদ্মা ব্যাংকে ৪৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা আটকে রয়েছে। এর মধ্যে সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, রূপালী ব্যাংক, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি), জীবন বীমা করপোরেশন, সাধারণ বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, বিটিআরসি, মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর জীবন বীমা করপোরেশন, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস, মোংলা বন্দর অন্যতম। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড ও সংশ্লিষ্ট ট্রাস্টের প্রায় ৭৬০ কোটি টাকা পদ্মা ব্যাংকে জমা আছে, যা বছরের পর বছর ফেরত দিতে পারছে না।
যেভাবে পদ্মা ব্যাংক: পদ্মা ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ব্যাংকটির বর্তমানে ৬০টি শাখা, ১৪টি উপশাখা এবং ৬টি এজেন্ট আউটলেট রয়েছে। ব্যাংকটির জনবল প্রায় ১ হাজার ৬০০ জন। যদিও ২০১৩ সালে কার্যক্রম শুরুর মাত্র চার বছরের মাথায় অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে মুখ থুবড়ে পড়ে তৎকালীন ফার্মারস ব্যাংক। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা মহীউদ্দীন খান আলমগীরের চাপে রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদিত এই ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এগিয়ে আসে। বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, নাম পরিবর্তন, মূলধন জোগান এবং নজিরবিহীন নীতিগত সহায়তা দেয়। কিন্তু এর কোনোটি কাজে আসেনি; বরং ব্যাংকটি ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান করেছে, যা মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। বদনাম ঢাকতে ২০১৯ সালের ২৯ জানুয়ারি দ্য ফার্মারস ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করে পদ্মা ব্যাংক করা হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের অভিমত, শুরুতে ব্যাংকটিকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করাই ছিল ভুল। তাদের মতে, সে সময় ব্যাংকটি অবসায়ন করা অথবা জোরপূর্বক অন্য ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করা হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের খরচ অনেক কম হতো। এখন কর্তৃপক্ষ যদি ব্যাংকটি অবসায়নের উদ্যোগ নেয়, তাহলে এর বিপুল সঞ্চিত লোকসান ও মূলধন ঘাটতি সরকারকেই বহন করতে হবে— যার অর্থ জোগাতে হবে করদাতাদের টাকা থেকে। কেননা, ২০১৯ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক এবং রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ সংস্থা আইসিবি মিলে পদ্মা ব্যাংককে নতুন করে ৭১৫ কোটি টাকা মূলধন জোগান দেয়; কিন্তু সেই টাকা আর ফেরত দেয়নি।
মো. শওকত আলী খান রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের কারণে বিধান অনুযায়ী পদাধিকারবলে পদ্মা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান।
পদ্মা ব্যাংক সম্পর্কে তার ভাষ্য, ‘ব্যাংকটির তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। আমানত ও মূলধন শেষ হয়ে গেছে। সঞ্চিত লোকসান এখন ব্যাংকটির সম্পদ ও দায়ের পরিমাণকেও ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ আদায় ছাড়া কর্মকর্তাদের তেমন কোনো কাজ নেই। ব্যয় কমানোর জন্য ব্যবস্থাপনাকে অনেক আগেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। সরকারি নির্দেশে আমরা পদ্মা ব্যাংকে বিনিয়োগ করেছিলাম। এখন এর ভবিষ্যৎ কী হবে, সে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারকেই নিতে হবে।’



