তৌফিক খালিদী মোহ-নির্মোহ দ্বন্দ্বের যবনিকা

সংবাদের বাইরে গণমাধ্যমে কিছু লিখতে আমি খুব একটা কমফোর্ট ফিল করি না। ফেসবুকেই টুকটাক লিখি। কিন্তু এবারও লিখতে হচ্ছে। এর আগে বন্ধু মামুন (আগামীর সময়ের সম্পাদক, মোস্তফা মামুন) দেশ রূপান্তরের সম্পাদক থাকাকালে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছিল। দেশ রূপান্তরের প্রয়াত সম্পাদক অমিত হাবিব নিয়ে স্মৃতিচারণ। বেদনার বিষয় হলো, এবারও আমাকে স্মৃতি তর্পণই করতে হচ্ছে। অমিতদা মারা গিয়েছিলেন ষাট পূর্তির আগে আগে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীও মারা গেলেন ষাট পেরোবার একটু আগে। দুজনই চলে গেলেন ৫৯-এ। অমিতদা ও তৌফিক ভাই পরস্পরের বন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশের নিউজ ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভাবান হিসেবে তাদের আবির্ভাব ছিল। সম্পাদক হিসেবে এ ইন্ডাস্ট্রিকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তাদের। দুজনই আমার এবং মামুনের সম্পাদক ছিলেন। তাদের প্রয়াণ বাংলাদেশের সংবাদশিল্পের জন্য আক্ষরিক অর্থেই ক্ষত তৈরি করেছে।
সদ্যপ্রয়াত তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই দেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথ তৈরি করেছেন বললে বেশি বলা হবে না। ২০০৬ সালে তৎকালীন বার্তা সংস্থা বিডিনিউজের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি ২৪/৭ নিউজ সার্ভিসে রূপান্তরিত করেন। সে যাত্রায় মামুন, আমি, আরও অনেকেই তার নেতৃত্বে সেই মিশনে ছিলাম। আমি ছিলাম দীর্ঘদিন। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তৌফিক ভাই বলতেন, জঙ্গলটা কেটে রাস্তাটা বানাতে হবে আমাদের। সুতরাং, আমাদের কাজটা অনেক কঠিন। চল্লিশ বছরের একজন মেধাবী সাংবাদিক সেই সময় জঙ্গল কেটে কেটে রাস্তাটা নির্মাণ শুরু করেন। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর যখন চব্বিশ ঘণ্টার নিউজ রুম হিসেবে যাত্রা শুরু করে, তখন বাংলাদেশ তো দূরের কথা, ইন্টারনেট অনলি নিউজ রুম গোটা বিশ্বেই বিরল। নতুন মিডিয়ার যাত্রা কেন তিনি শুরু করলেন? তার ভাষায়, বিবিসি বাংলা বিভাগ বিবিসির বিশাল কর্মযজ্ঞে একেবারে নমশূদ্র একটা খোপ। তিনি ওটাকে কেরানিগিরির বেশি ভাবতে পারতেন না। বেতন যা পেতেন তাতে তার বাড়ি ভাড়াও হয় না এমন। ঢাকা শহরের সম্পন্ন ঘরের ছেলে। নিজেদের বাড়ি আছে ধানমন্ডিতে। বাবা-মা দুজনই সিভিল সার্ভিসে ছিলেন। দেশে চাকরি করার সময় ত্রিশ বছর হতেই তিনি দেশের সেরা পত্রিকার নিউজ রুম লিডার। এখন না দেশে ভূরি ভূরি সংবাদমাধ্যম। এক হাউজেই অনেক অনেক আলংকারিক পদ। তখন তো চিত্র এমন না। এই ব্যাকগ্রাউন্ডের কারও কাছে বিবিসি বাংলা সার্ভিসের খোপবন্দি জীবন ভালো লাগার কথা নয়। তার ওপর ছিল সাদা চামড়ার দাপট। একটি ঘটনা তার কাছে শোনা। বিবিসির মিড লেভেলের এক বস তাকে কিছু ডিকটেইট করতে এলে তিনি খুব রেগে বলেছিলেন, গায়ের রঙের কারণে তুমি আমাকে নির্দেশ দিতে পারছ। গায়ের রঙ সাদা হলে আমি তোমার কয়েক লেয়ার ওপরে থাকতাম। আমি জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন, ব্রিটিশদের মধ্যে সাটল রেসিজম রয়ে গেছে। একদিন টিউব স্টেশনে এক বৃদ্ধা নাকি তৌফিক ভাইকে দেখাচ্ছিলেন নিচে পয়সা পড়ে আছে সেটা তুলতে। সেই সময় বিবিসির অনলাইন সার্ভিসের বাজেট দেখে তার চোখ আটকে যায়। বাজেট জাম্প করেছে কয়েকগুণ। বিবিসির রিসার্চ উইং ভাবছিল, সামনের দুনিয়া ইন্টারনেটে। সংবাদমাধ্যমেরও গন্তব্য ইন্টারনেটে। তৌফিক ভাই আইডিয়াটা সেখান থেকে পেলেন। বিবিসি বাংলার চাকরি পছন্দ না করলেও বিবিসির ম্যানেজমেন্ট স্টাইল, তার এডিটরিয়াল স্ট্যান্ডার্ড সবকিছুতে তৌফিক ভাই ছিলেন অবসেসড। ধারণা করি তার এ অবসেশন মৃত্যুর আগপর্যন্ত বজায় ছিল।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পারস্পেকটিভ ও কনটেক্সট খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি কোন দিক থেকে ঘটনাকে দেখছেন এবং কোন প্রাসঙ্গিকতায় একটি তথ্যকে খবর আকারে পরিবেশন করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৌফিক ভাই প্রকাশ্যেই বলতেন, আনুষ্ঠানিকভাবেই বলতেন, আমরা নিরপেক্ষ নই। আমরা বস্তুনিষ্ঠ
দেশে ফিরে তিনি যোগ দিলেন একুশে টেলিভিশনে। সেখানেই মালিকপক্ষের সঙ্গে সমস্যা দেখা দিল। তখন অবশ্য একুশে টেলিভিশন অফ এয়ারে ছিল। এরপর একটি পিআর কোম্পানি চালু করলেন। প্রয়াত রেগুলেটরি এক্সপার্ট ও সাংবাদিক আবু সাঈদ খানের সূত্রে এডিএন গ্রুপের মালিক আসিফ মাহমুদের সঙ্গে সম্পর্ক। আসিফ মাহমুদ রাজ, তৌফিক ভাই তারা একই গ্রেটার সার্কেলের মানুষ। তৌফিক ভাই রেসিডেন্সিয়াল মডেলের, আসিফ মাহমুদ রাজ ভাই সেন্ট জোসেফের। বড়ও হয়েছেন ধানমন্ডিতে। তৌফিক ভাইয়ের উদ্যোগে এবং রাজ ভাইয়ের অর্থায়নে বার্তা সংস্থা বিডিনিউজ টেক ওভার করা হয়। দুজনের মধ্যে বন্ধুর সম্পর্ক এবং নীতিগত ঐক্য থাকায় এডিটরিয়াল ইস্যুতে তৌফিক ভাই স্বাধীন সিদ্ধান্ত দিতেন। ঘনিষ্ঠভাবে কাজের সুবাদে জানি, এডিটরিয়াল স্বাধীনতার বিষয়ে তৌফিক ভাই একবিন্দু ছাড় দেওয়ার মানুষ নন। ১৯ বছর ধরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের অপারেশনে নানা ভ্রান্তি ও সংকট এসেছে কিন্তু এডিটরিয়াল জাজমেন্টে তৌফিক ভাই ভালো-মন্দ সিদ্ধান্ত নিজেই নিয়েছেন। তার মৃত্যুতে সামাজিক মাধ্যমে পাঠক-লেখকরা দেখছি তার চরিত্রের এদিকটিই সেলিব্রেট করছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর পরিচালনা করতে করতে বেক্সিমকোর অর্থায়নে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন স্টেশন চালুর উদ্যোগ নেন তিনি। এডিটরিয়াল ইন্ডিপেন্ডেন্স মানে আপনি কী পাবলিশ করবেন শুধু সেটার স্বাধীনতা নয়, আপনি প্রতিষ্ঠান কীভাবে চালাবেন, কাকে নিয়োগ করবেন-কাকে করবেন না, এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। তৌফিক ভাইয়ের অভিযোগ ছিল, মালিকপক্ষ প্রতিশ্রুতি রাখতে পারছিল না। একপর্যায়ে তিনি সেখান থেকে সরে আসেন।
ব্যক্তি মানুষের সমালোচনা থাকবেই। তৌফিক ভাইয়েরও সমালোচকের অভাব ছিল না। তার মৃত্যুর পরও অনেকে তার বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বমূলক সাংবাদিকতার অভিযোগ তুলছে। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে পারস্পেকটিভ ও কনটেক্সট খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আপনি কোন দিক থেকে ঘটনাকে দেখছেন এবং কোন প্রাসঙ্গিকতায় একটি তথ্যকে খবর আকারে পরিবেশন করছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৌফিক ভাই প্রকাশ্যেই বলতেন, আনুষ্ঠানিকভাবেই বলতেন, আমরা নিরপেক্ষ নই। আমরা বস্তুনিষ্ঠ। আমরা ফ্যাক্ট ডিস্টোর্ট করি না। মুক্তিযুদ্ধ, উদারতাবাদ, ভোক্তা স্বার্থ, পাবলিক গুড এসবের অ্যাডভোকেসি তিনি করেছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে আমি বলতে পারি, সরকারের কাছ থেকে আনডিউ কোনো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা তিনি করেননি। তিনি চেষ্টা করেছিলেন, সেই সরকারকে দিয়ে মিডিয়ায় একটি রেগুলেটরি মেকানিজম ইন্ট্রোডিউস করতে। তার পক্ষে তিনি নানা জায়গায় কথা বলেছেন। এ দেশে যে কথার মিসইন্টারপ্রিটেশন হয়, তার সাক্ষী আমি নিজে। রেগুলেশন মানে কন্ট্রোল নয়। বাংলাদেশের আনরেগুলেটেড মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি এ দেশে অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করছে। তবে হ্যাঁ, আমাদের মতো দেশে রেগুলেটরি মেকানিজম তৈরি মানেই সরকারের হাতে তলোয়ার তুলে দেওয়া। তিনিও সে বিষয়ে সচেতন ছিলেন।
তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যু সংবাদশিল্পের ক্ষতি যেমন, তেমনি ক্ষতি একটা কালচারেরও। কাদের ক্ষতি? আমরা এখনো যারা মনে করি, সাংবাদিকতা একটা লাইফস্টাইল। আমরা মনে করি, সাংবাদিকতা নিছক জীবিকা না। ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নিমগ্ন না থেকে সারাক্ষণ রাজনীতি, অর্থনীতি ও খবরের পেছনে একই সঙ্গে প্যাশনেটলি এবং ডিসপ্যাশনেটলি লেগে থাকা— এটাই লাইফস্টাইলে সাংবাদিকতা। এ লাইফস্টাইলে বুঁদ থেকে জীবনে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। বন্ধুত্ব, সংসার, ভালোবাসা। কথা হয়নি দীর্ঘদিন। তবুও মনে হয়েছে, তৌফিক ভাই খুব নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। বন্ধুহীন, ভালোবাসাহীন জীবনযাপন করা অনেকের জন্য কষ্টের। অ্যাটলিস্ট, যারা ভালোবাসতে জানেন তাদের জন্য।
লেখক: সাংবাদিক




