ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণে ‘হোসেনস মেথড’

ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন
ভারতীয়, ইউরেশীয় ও বর্মি— তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে রয়েছে। এ অবস্থায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণ, ফল্ট লাইনের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং ভূত্বকের পরিবর্তন বিশ্লেষণে পুরনো গবেষণাকেও আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে ‘হোসেনস মেথড অব এক্সটেনশন’। প্রায় ৫৬ বছর আগে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণার সময় এ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন খ্যাতনামা ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। আগামীর সময়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ পদ্ধতির তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক তুলে ধরেন।
ড. মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে শিলাস্তরের বিকৃতি, সম্প্রসারণ ও ফাটল প্রক্রিয়া বোঝার জন্য গাণিতিক ও কাঠামোগত পদ্ধতি হিসেবেই ‘হোসেনস মেথড অব এক্সটেনশন’ তৈরি করা হয়েছিল। তার দাবি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও ভূ-পদার্থবিদ্যার উচ্চতর গবেষণায় এ পদ্ধতি রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, কোনো পদ্ধতির মাধ্যমেই ভূমিকম্পের সুনির্দিষ্ট সময়, তারিখ বা স্থান আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলে দেওয়া বর্তমানে সম্ভব নয়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি নিরূপণ, ফল্ট লাইনের আচরণ পর্যবেক্ষণ এবং কোথায় ভূত্বকে চাপ ও বিকৃতি জমা হচ্ছে, তা বিশ্লেষণে এ ধরনের পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডাউকি ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং চট্টগ্রাম-ত্রিপুরা ভাঁজ অঞ্চলের ভূগঠন বিশ্লেষণে ‘হোসেনস মেথড’ ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। ভূত্বকের কোথায় কতটা প্রসারণ বা বিকৃতি হচ্ছে, কোন এলাকায় ভূ-চাপ জমা হচ্ছে এবং কোন ফল্ট এলাকায় পরিবর্তনের হার বেশি— এসব তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে সম্ভাব্য ঝুঁকিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ড. মোশাররফ হোসেন বলেছেন, ১৯৭০-এর দশকে উদ্ভাবিত এ পদ্ধতিকে বর্তমান প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। জিপিএস, উপগ্রহচিত্র, ভৌগোলিক তথ্যব্যবস্থা এবং রাডারভিত্তিক ভূ-পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তির তথ্যের সঙ্গে ‘হোসেনস মেথড’ যুক্ত করা গেলে এর ব্যবহারিক কার্যকারিতা আরও বাড়তে পারে। বাংলাদেশের ফল্ট লাইনগুলোর আশপাশের ভূ-প্রসারণ ও টেকটোনিক পরিবর্তনের তথ্য ব্যবহার করে কম্পিউটারভিত্তিক ভূকম্পন-ভূগঠন মডেলও তৈরি করা সম্ভব।
এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েটসহ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর পর্যায়ে গবেষণা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষায়িত জাতীয় ভূকম্পন ও টেকটোনিক গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দেন।
দেশ জুড়ে পর্যাপ্তসংখ্যক জিপিএস ও ভূকম্পন মাপক যন্ত্র স্থাপন করে ভূত্বকের গতিবিধি নিয়মিত পর্যবেক্ষণের কথাও বলেছেন তিনি। তার মতে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ভবন নির্মাণ বিধিমালা ও ভূমিকম্প ঝুঁকি মানচিত্র নিয়মিত হালনাগাদ করা প্রয়োজন।



