ইয়েতির হাত!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
হিমালয় পর্বতমালার অন্যতম সুন্দর পর্বতের নাম আমা দাবলাম। ২২ হাজার ৩৪৯ ফুট উচ্চতার এই পর্বতের পাদদেশের ছোট্ট গ্রাম প্যাংবোচে। গ্রামের উচ্চতাও নেহাত কম নয়; সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৩ হাজার ৭৪ ফুট উঁচুতে অবস্থিত প্যাংবোচে। নেপালের একদম প্রথমদিকের শেরপা বসতি এই গ্রাম। অবশ্য এখানকার অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক আর আধ্যাত্মিক শিকড় তিব্বতে। এভারেস্ট বেস ক্যাম্প এখান থেকে মানুষের পায়ে চলার গতিভেদে দুই বা তিন দিনের পথ। দেবভূমির কন্দরে অবস্থিত অনিন্দ্যসুন্দর এই গ্রামকে ঘিরে আছে হিমালয়ের সবচেয়ে বড় রহস্য ইয়েতি-সংক্রান্ত এক বিতর্ক। নেপালের এ অঞ্চল বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে আসে সপ্তদশ শতাব্দীতে। লোকগাথা মতে, নানা আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী সাংওয়া দোরজে নামের এক ধর্মগুরু তিব্বতের মালভূমি থেকে হিমালয় পর্বতমালার ওপর দিয়ে উড়ে এসে প্যাংবোচে গ্রামের একটা পাথরে অবতরণ করেন। ধ্যান করতে খুম্বু অঞ্চলের এক নির্জন গুহায় আশ্রয় নেন সাংওয়া দোরজে। ওই গুহায় এক ইয়েতি আগে থেকেই বসবাস করছিল। লামার টানা গুহাবাসের সময় ওই ইয়েতি তার ভক্ত বনে যায়! ধ্যানস্থ লামার জন্য খাবার, পানি এবং জ্বালানির ব্যবস্থা করত সেই ইয়েতি। ইয়েতিটির মৃত্যুর পর দেহাবশেষ থেকে একটি হাত ও মাথার খুলির চামড়া সংগ্রহ করে মনাস্ট্রিতে দান করেন সাংওয়া দোরজে। ধর্মগুরুর দান করা দেহাবশেষকে অতীব পবিত্র মনে করে আগলে রাখতে শুরু করে উপাসনাগৃহের লামারা। নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এই দেহাবশেষকে ঘিরে চলত উৎসব।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহির্বিশ্বের মানুষের জন্য নেপালের দ্বার উন্মুক্ত হয়। হিমালয় জুড়ে তখন চলছিল পর্বতারোহণের স্বর্ণযুগ। পর্বতারোহী আর ট্রেকারদের পাশাপাশি ইয়েতি বা হিমালয়ের তুষারমানবের খোঁজেও আসতে শুরু করে অনেকে। তেমনই একজন টেক্সাসের ধনকুবের তেল ব্যবসায়ী টম স্লিক। ইয়েতি, বিগফুট, লচ নেস মনস্টার প্রভৃতি পৌরাণিক প্রাণী নিয়ে ছিল তার অতীব আগ্রহ। ১৯৫৭ সালে এমনই এক ইয়েতি অনুসন্ধান অভিযানে নেপাল এসে অসুস্থ হয়ে পড়ায় অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেন পিটার ব্যারনে ও ব্রায়ান ব্যারনে নামক দুই অভিযাত্রী ভাইকে। পিটার ঘুরতে ঘুরতে পা রাখেন সলোখুম্বু অঞ্চলের প্যাংবোচে গ্রামে। গ্রামের উপাসনাগার ঘুরে দেখার সময়ে জানতে পারেন, এই মনাস্ট্রির লামাদের তত্ত্বাবধানে আছে ইয়েতির মাথার খুলির চামড়া ও একটি হাত। এক লামার সহায়তায় ইয়েতির হাত ও মাথার খুলির চামড়াটি দেখেন পিটার। হাতটি প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তিনি লেখেন, ‘দেখতে বড়সড় মানুষের হাতের মতোই। হাতের আবরণকারী ত্বকটি শক্ত ও কালচে। মন্দিরে সব সময় মোমবাতি ও তেলের কুপি জ্বলতে থাকায় হাতটি খুবই তৈলাক্ত। আর আঙুলগুলো বড়শির মতো কুঁচকানো ও বাঁকানো।’
পিটার বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ইয়েতির হাতটি পাশ্চাত্যে নিয়ে যেতে চাইলে মনাস্ট্রির লামারা রাজি হননি। ১৯৫৮ সালের শেষ নাগাদ ফের নেপাল আসেন তিনি। এবার সঙ্গে নিয়ে আসেন মাথাভর্তি কূটবুদ্ধি আর ইয়েতির আঙুলের মতো দেখতে মানুষের একটি আঙুলের অবিকল প্রতিরূপ! বলা হয়, মনাস্ট্রির এক বন্ধুবৎসল লামাকে অঢেল স্কচ পান করিয়ে তার চোখের সামনেই আঙুল প্রতিস্থাপন করেন তিনি।
পরে আঙুলটি লুকিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের কলকাতায় চলে আসেন পিটার। সেখানে সাক্ষাৎ করেন তৎকালীন প্রখ্যাত হলিউড অভিনেতা জেমস স্টুয়ার্ট ও তার স্ত্রী গ্লোরিয়া স্টুয়ার্টের সঙ্গে। অভিযানের উদ্যোক্তা টম স্লিক পূর্বানুমান করেছিলেন, বিখ্যাত হলিউড অভিনেতাকে বিমানবন্দরের শুল্ক কর্মকর্তারা খুব বেশ ঘাঁটাবেন না। স্টুয়ার্টের স্ত্রী গ্লোরিয়ার অন্তর্বাসের মধ্যে আঙুলটি পেঁচিয়ে শুল্ক কর্মকর্তাদের ফাঁকি দেওয়া হয়। কলকাতা থেকে আঙুলটি নিয়ে আসা হয় লন্ডনে। জেমস স্টুয়ার্ট সেটি হস্তান্তর করেন প্রখ্যাত প্রাইমেট বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম ওসমান হিলের কাছে। জেমস স্টুয়ার্ট ও ওসমান হিল দুজনেই ছিলেন টম স্লিকের বন্ধু।
ওসমান হিলের গবেষণায় প্রমাণিত হয়, সংগৃহীত আঙুলটি হোমিনিড গোত্রের প্রাণীর। উল্লেখ্য, আধুনিক মানুষও এই গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। ১৯৬২ সালে বিমান দুর্ঘটনায় টম স্লিক ও ১৯৭৫ সালে ওসমান হিল ধরাধাম ত্যাগ করেন।
১৯৯১ সালে জনপ্রিয় টিভি শো ‘আনসলভড মিস্ট্রি’র পক্ষ থেকে এই আঙুলের একটি অংশ সংগ্রহ করে ফের পরীক্ষাগারে নেওয়া হয়। গবেষণায় উঠে আসে, আঙুলের সংগৃহীত অংশ থেকে প্রাপ্ত টিস্যু মানুষের টিস্যুসদৃশ, তবে মানুষের নয়। আনসলভড মিস্ট্রির পর্বটি প্রচারিত হওয়ার পর প্যাংবোচে মনাস্ট্রিতে রক্ষিত ইয়েতির মিশ্র হাতটি চুরি যায়। আজ অবধি তার হদিস মেলেনি।
নিউজিল্যান্ডের এভারেস্টের চূড়ায় আরোহণ করা পর্বতারোহী ও এয়ার নিউজিল্যান্ডের পাইলট মাইক এলসপকে প্যাংবোচের হারিয়ে যাওয়া ইয়েতির হাতের ব্যাপারটি গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই হাতের একটি অবিকল প্রতিরূপ বানানোর ব্যবস্থা করে তিনি মনাস্ট্রিতে দান করেন ২০১০ সালে। ট্রেকারদের ইয়েতির হাত দেখিয়ে উপাসনালয়ের ব্যয় মেটানোই হাতের প্রতিরূপ বানানোর উদ্দেশ্য। মাইক এলসপ ‘রিটার্ন দ্য হ্যান্ড’ নামে একটি ওয়েবসাইটও চালান।
ইয়েতির প্রতি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর গভীর সাংস্কৃতিক সম্মোহন এখনও কমেনি। এ অঞ্চলের মানুষের জিন-মানচিত্রে ইয়েতিবিষয়ক লোককথা বহমান থাকবে অনাদিকাল।



