মিরপুরের ফুটপাতে ফিরেছে স্বস্তি, হকাররা এখন কোথায়

হকারমুক্ত ফুটপাতে স্বস্তিতে পথচারীরা। ছবি: আগামীর সময়
‘বুঝতেই পারছি না, এটা মিরপুর নাকি অন্য কোনো জায়গা।’ মিরপুর গার্লস আইডিয়াল স্কুলের সামনের ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলছিলেন সায়মা জেরিন। মিরপুরের বাসিন্দা এই তরুণী একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। প্রতিদিনই এই পথ দিয়ে চলাচল করতে হয় তাকে।
সায়মা বলেন, মিরপুর-১০ গোলচত্বর থেকে ফুটপাত ধরে হাঁটতে গেলে আগে জ্যামে আটকে যেতে হতো। ফুটপাতের দুই পাশে থাকত অস্থায়ী দোকান। মাঝখানে একজন করে হাঁটার মতো জায়গা থাকত। একসঙ্গে দুজনের হাঁটাও কঠিন ছিল। এখন সেই ফুটপাত হকারমুক্ত। পথচারীরা নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন। এমনকি পথচারীদের চলাচলের পরও ফুটপাতের একাংশ ফাঁকা থাকছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সরেজমিনে মিরপুর-১০ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, উচ্ছেদ অভিযানের পর বদলে গেছে দীর্ঘদিনের চেনা দৃশ্য। রাস্তার দুই পাশের ফুটপাত থেকে সরেছে অস্থায়ী দোকান। আগে যেখানে টেবিল, চৌকি, ভ্যান কিংবা বাঁশের কাঠামোর ওপর ত্রিপল টাঙিয়ে দোকান বসানো হতো, সেখানে এখন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছেন পথচারীরা।
নারী ও শিশুদের পোশাক, জুতা, অলংকার, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকানের পাশাপাশি ছিল ফুচকা, চটপটি ও ভাজাপোড়ার দোকান। অনেক দোকান ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়কের অংশও দখল করে বসানো হয়েছিল। ফলে পথচারীদের পাশাপাশি যানবাহন চলাচলেও তৈরি হতো চাপ।
বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও অভিযান শেষ হওয়ার পরই আবার ফুটপাতে ফিরতেন হকাররা। তবে এবারের অভিযানের পর কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও মিরপুর-১০ এলাকায় আগের মতো অস্থায়ী দোকান দেখা যায়নি।
গত বুধবার ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। এ সময় হকার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষ হয়। সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের একটি গাড়ি ও উচ্ছেদ অভিযানে ব্যবহৃত একটি এক্সকাভেটরও ভাঙচুর করা হয়।
অভিযানের সময় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পশ্চিম পাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলে ডিএনসিসির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীর নেতৃত্বে আবারও উচ্ছেদ অভিযান শুরু হয়।
মিরপুর-১০-এর হোপ মার্কেটের সামনের গলি দিয়ে বাইকে স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছিলেন রশিদ আহমেদ। চাকরির সুবাদে প্রায় ছয় বছর ধরে মিরপুরে থাকেন তিনি। বলছিলেন, ‘মিরপুরের গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেট পর্যন্ত অল্প দূরত্বের জায়গা পার হতেই বেশ সময় লেগে যেত। দোকানগুলো ফুটপাত ছাড়িয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত চলে আসত। এর সঙ্গে রিকশা তো ছিলই। ফলে জ্যামে পড়তে হতো। এবার অভিযান চালানোর পর ফুটপাতে কোনো হকার নেই। রাস্তাই ফাঁকা ফাঁকা লাগে।’
তার ভাষ্য, আগে সকালে অভিযান চালানোর পর বিকালেই আবার হকাররা বসে যেতেন। এবার কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও ফুটপাত হকারমুক্ত রয়েছে।
কেন ফিরছেন না হকাররা
স্থানীয় হকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকেই মিরপুরে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছিল। কখনো ভোরে, কখনো সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়েছে সিটি করপোরেশন। তবে অভিযান শেষ হওয়ার পর একই দিন বা পরদিনই আবার ফুটপাতে দোকান নিয়ে বসতেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক হকার বলেন, ‘কিছুদিন ধরে সিটি করপোরেশন বেশ সক্রিয় ছিল। হঠাৎ করে অভিযান চালাত। উচ্ছেদ করে মালামাল নিয়ে গেলে পরে আবার সিটি করপোরেশনের লোকজনের কাছ থেকেই জিনিসপত্র কিনে দোকান বসাতাম।’
এবারের অভিযানের পর পরিস্থিতি ভিন্ন। সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় মামলা ও আটকের কারণে হকাররা আপাতত ফিরতে সাহস পাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন মিরপুর-১০ রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সামনে বসা হকার মো. নাজিম। বলছিলেন, ‘মিরপুর-১০-এর ওই সড়কের দুই পাশে শতাধিক হকার বসতেন। পুলিশ আটকের পর থেকে কেউ আর দোকান নিয়ে বসতে সাহস পাচ্ছেন না। সবাই পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন।’
সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ওইদিন ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে ৩০ জনকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় তিনটি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সিটি করপোরেশনের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় একটি, পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে একটি এবং ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে আরেকটি মামলা করা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন করে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে। কাফরুল থানায়ও পৃথক একটি মামলা হয়েছে। চার মামলায় মোট আসামির সংখ্যা প্রায় দুই হাজার।
ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেছেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করার কর্মসূচি চলমান থাকবে। কাঙ্ক্ষিত সফলতা না আসা পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগের অংশ হিসেবে মিরপুর-১০ নম্বরে একটি মনিটরিং টিমও গঠন করেছে ডিএনসিসি। প্রশাসক তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে আজ জানিয়েছেন, মনিটরিং টিম নিয়মিত এলাকা পর্যবেক্ষণ করবে। ফুটপাত দখল করে কোনো দোকান বা স্থাপনা বসানো হলে মালামাল ও সরঞ্জাম জব্দ করা হবে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোথায় আছেন হকাররা
দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল কলেজের সামনে ভ্যানে সবজি বিক্রি করতেন সোহেল মোল্লা। উচ্ছেদের পর আর দোকান বসাতে পারছেন না তিনি। সোহেল জানান, ১২ বছর ধরে ওই এলাকায় নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল বিক্রি করছেন। এর আগেও একাধিকবার উচ্ছেদ করা হলেও পরে আবার দোকান বসিয়েছেন। এবার পরিস্থিতি ভিন্ন।
তিনি বলেন, ‘আমার একটি পা ভাঙা। স্কেচে ভর দিয়ে চলি। এই দোকান থেকে যা আয় হতো, তা দিয়েই পরিবার চলত। এখন দোকানটিও নেই। এই অবস্থায় আমার তো ভিক্ষা করা ছাড়া করার কিছু নেই। সরকার আমাদের উঠিয়ে দিয়েছে, কিন্তু বিকল্প কিছু করার ব্যবস্থা তো করে দিতে হবে।’
আগেরবার উচ্ছেদের পর পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দোকান দিয়েছিলেন জানিয়ে সোহেল দাবি করেন, সেই ঋণ এখনো শোধ করতে পারেননি তিনি।
মিরপুরের ফুটপাত দিয়ে চলাচলকারী আয়েশা সিদ্দিকী বলেন, ‘উচ্ছেদের আগে দুই পাশের ফুটপাত অস্থায়ী দোকানে ভরা থাকত। তুলনামূলক কম দামে সেখানে বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যেত। অন্য এলাকা থেকেও অনেকে কেনাকাটা করতে আসতেন। আমিও এখান থেকে অনেক কিছু কিনেছি। তবে ফুটপাত যেহেতু পথচারীদের হাঁটার জায়গা, তাই সরকারের উদ্যোগ মানতে হবে। এখন অন্তত স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করা যাচ্ছে।’
তবে হকারদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে শুধু উচ্ছেদ করলে ফুটপাতে হকার সমস্যা সমাধান হবে না বলে জানালেন নগর পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান। তিনি বলেন, ‘দেখতে হবে কতদিন ফুটপাত হকারমুক্ত থাকে। যেহেতু একটি বড় অংশের হকারদের জীবিকা ছিল সেখানে, তাই তাদের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে আগে। নইলে শুধু উচ্ছেদ করে ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা যাবে না। কোথাও না কোথাও তারা আবার বসবেই।’
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও ঢাকা-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাস্তা মানুষের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ও পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। তবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকার কথাও বিবেচনায় নিতে হবে।’
শুধু মিরপুর-১০ নয়, সম্প্রতি রাজধানীর আরও কয়েকটি এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে। ফার্মগেট ওভারব্রিজও একসময় হকারদের দখলে অনেকটা অস্থায়ী মার্কেটে পরিণত হয়েছিল। ওভারব্রিজের দুই পাশে নানা ধরনের দোকান বসায় পথচারীদের চলাচলে ভোগান্তি হতো। ব্রিজ পার হতে গাদাগাদি করে লাইনে দাঁড়াতে হতো।
তবে উচ্ছেদ অভিযানের পর এখন ওই ওভারব্রিজেও কোনো হকার নেই। স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারছেন পথচারীরা। ফলে মিরপুর-১০-এর মতো ফার্মগেটেও উচ্ছেদের পর ফুটপাত ও পথচারীদের চলাচলের জায়গা অনেকটা স্বাভাবিক হয়েছে।
সরানো হচ্ছে পোড়া মালামাল
উচ্ছেদ অভিযানের সময় বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদের পশ্চিম পাশের একটি ভবনে আগুন লাগে। ভবনটিতে বেশ কয়েকটি দোকান ছিল। জুতা, পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি হতো সেখানে। আগুনে দোকানগুলোর মালামাল পুড়ে যায়। আজ দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, পোড়া মালামাল সরিয়ে জায়গাটি পরিষ্কার করছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা।
দোকানি মো. শরিফুল ইসলাম জানান, তার দোকানে প্রায় ১০ লাখ টাকার কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ছিল। আগুনে সব পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এটি আমার স্থায়ী দোকান। মসজিদ কমিটির কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ৩০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। বাইরের অস্থায়ী দোকান সরাতে গিয়ে ভেকু দিয়ে টান দেওয়ার পর শর্টসার্কিট থেকে আমার দোকানে আগুন লাগে। শুরুতে সিটি করপোরেশনের লোকজন বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। ফলে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে।’
‘আমার দোকানে দুজন কর্মচারী আছে। এত টাকা ক্ষতি হয়েছে, এখন তাদের বেতনও দিতে পারব না। এ ঘটনায় অনেকগুলো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, পরিকল্পিতভাবে মসজিদে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।







