রুবেলের উদ্যোগে ১৩০০ মানুষের কর্মসংস্থান

কারখানায় কর্মীদের সঙ্গে রুবেল
কাজের অভাবে তাঁতিরা পরিবার ছেড়ে দূরে পড়ে থাকেন— এই কষ্ট গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল ‘মণিপুরী উইভিং ফ্যাক্টরি’র স্বত্বাধিকারী এম এইচ রুবেলকে। এসব মানুষকে নিজ এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ দিয়ে পরিবারের সঙ্গে রাখার মানবিক তাগিদ থেকেই পথচলা শুরু করেন তিনি। সেই অবহেলিত কারিগরদের দক্ষতা কাজে লাগাতে কুড়িগ্রামের রৌমারীর চরশৌলমারী ইউনিয়নে ২০২১ সালে তিনি কারখানা গড়ে তোলেন। তার অনন্য উদ্যোগে কর্মসংস্থান হয়েছে ওই এলাকার প্রায় ১ হাজার ৩০০ মানুষের।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সহায়তায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রৌমারীর তাঁতিদের খুঁজে বের করেন রুবেল। তাদের উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি নিজ খরচে তাঁতের উপকরণ সরবরাহ করেন। রুবেল জানিয়েছেন, তার কারখানায় সরাসরি ৪০০ কারিগর কাজ করছেন। এর বাইরে সুতা প্রস্তুতকরণ, রঙ করা ও শুকানো মিলিয়ে যুক্ত আছেন আরও ৯০০ শ্রমিক। উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে স্থানীয় আরও ৮-১০ জন মহাজনের শাড়িও কেনেন তিনি।
কারখানার বিশাল কর্মযজ্ঞ নিয়ে ম্যানেজার মোহাম্মদ নওশাদ আলী বলেছেন, ‘সরাসরি কারিগরদের বাইরেও পরোক্ষ কাজ মিলিয়ে এত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমাদের পুরো এলাকার অর্থনীতি এখন বদলে গেছে।’
৪১ বছর বয়সী রুবেলের বাড়ি সিলেটে হলেও বর্তমানে ঢাকায় থাকেন। সেখানে নিজস্ব শোরুম থাকার পাশাপাশি ব্যবসার বিস্তৃতি সারা দেশ ও দেশের বাইরে। একসময় চরশৌলমারীতে তাঁতশিল্পের প্রসার থাকলেও কালের বিবর্তনে তা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কাজের অভাবে এলাকার অনেক তাঁতি পরিবার ছেড়ে ঢাকা, সিরাজগঞ্জ, পাবনায় গিয়ে তাঁতশ্রমিকের কাজ নেন। রুবেল শুনতেন তাদের অভাব ও ন্যায্য মজুরি না পাওয়ার বেদনার কথা। মূলত তার উদ্যোগেই রৌমারীতে বিলুপ্তপ্রায় এই শিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। পরিবার-বিচ্ছিন্ন মানুষের কষ্ট ঘোচাতে তাদের নিজ এলাকায় ফিরিয়ে আনার মানবিক উদ্যোগ নেন তিনি।
রুবেলের এই উদ্যোগে স্বস্তির কথা জানালেন চরশৌলমারীর তাঁতি আমির চান। তিনি বললেন, ‘আগে কৃষিকাজ করতাম। মজুরি ছিল ২০০-২৫০ টাকা। তবে রুবেল ভাই এলাকায় কারখানা দেওয়ায় এহন বাড়িতেই তাঁতের কাজ করি। পরিবারের সবাই মিল্যা কাজ করি, আয়-রোজগারও অনেক ভালো। একটা শাড়ি বানাইলে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা পাওয়া যায়।’
রুবেলের ভাষ্য, ‘আমার মনে হয়েছে, রৌমারী সবচেয়ে অবহেলিত এলাকা। এখানকার মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। আমার দ্বারা যদি মানুষের কর্মসংস্থান হয়, এর ফলাফল আল্লাহতায়ালা দেবেন।’
আগে যারা দিনমজুরি করতেন, তাঁতের আয়ে তাদের জীবনমানেও পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ২৫০-৩০০ থেকে বেড়ে ৬০০-৭০০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার বাঙালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে এখানকার শাড়ি। ভারতেও রয়েছে রুবেলের নিজস্ব শোরুম।
রুবেল বললেন, ‘অবহেলিত মানুষ যাতে নিজ বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভালো থাকতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই চরশৌলমারী এলাকায় এই কারখানাটি গড়ে তোলা হয়েছে। আমি প্রচারে নয়, কাজে বিশ্বাসী।’
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড রৌমারী সাব-বেসিক সেন্টারের দায়িত্বপ্রাপ্ত লিয়াজোঁ অফিসার মো. সাইদুজ্জামান বললেন, ‘এম এইচ রুবেলের এই মানবিক উদ্যোগটি এখানে অভাবনীয় সফলতা পেয়েছে। তার এই সফল কর্মযজ্ঞের কারণে অবহেলিত তাঁতিরা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন এবং এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এমন সম্ভাবনাময় উদ্যোগে আমরাও সার্বিক সহায়তা দিচ্ছি।’



