ট্রাম্প-বিবির মৃত্যু চায় ইরানিরা

সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে (বিবি) হত্যার দাবি করেছেন ইরানের শোকার্ত ও ক্ষুব্ধ জনতা। ‘ডেথ টু আমেরিকা’, ‘ডেথ টু ইসরায়েল’ স্লোগানে গতকাল রবিবার কেঁপে ওঠে রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা ও আশপাশের এলাকা। এখানেই এদিন সকালে দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজা হয়েছে। এতে অংশ নেন লাখ লাখ মানুষ। শোকার্ত মানুষের ভিড়ে পুরো তেহরানই রূপ নেয় জনসমুদ্রে।
এপির খবরে বলা হয়, গতকাল গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদ কমপ্লেক্সে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রথম জানাজার আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নিতে আসা লাখ লাখ মুসল্লির মিছিলে সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করা ব্যক্তি সরাসরি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে হত্যার আহ্বান জানান। এরপর মিছিলের সবাই ট্রাম্পের মৃত্যু কামনা করে তার সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে স্লোগান দিতে শুরু করেন।
নিজের বক্তব্যের সময়ও উপস্থিত জনতার কাছ থেকে ‘আমেরিকার মৃত্যু হোক’ এবং ‘ইসরায়েলের মৃত্যু হোক’ স্লোগান আদায় করেন ইরানের জনপ্রিয় কবি মোহাম্মদ রাসুলি। জানাজার ময়দানে স্থাপিত উচ্চ ক্ষমতার মাইকে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটি এখনো কেন বেঁচে আছে?’
তার এ প্রশ্নে উপস্থিত জনতা উল্লাসধ্বনি দেয়। পরে রাসুলি যখন বললেন, ‘ট্রাম্পের জন্য পৃথিবী আর ভালো জায়গা নয়’, তখনো জনতা একইভাবে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে।
এর আগে খামেনির জানাজা ঘিরে তেহরানের বিভিন্ন সড়ক ও দেয়ালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হত্যার আহ্বানসংবলিত পোস্টার ও দেয়াললিখন দেখা গেছে।
গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনি ও তার নিহত পরিবারের সদস্যদের জানাজায় ইমামতি করেন দেশটির ৯৭ বছর বয়সী শিয়াধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ জাফর সোবহানি। জানাজা মোট তিনটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে প্রথম ধাপের জানাজা পড়া হয় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির। দ্বিতীয় ধাপে সাইয়্যেদাহ বুশরা হোসাইনি খামেনি, শহীদ মেসবাহ আল-হোদা বাঘেরি এবং শহীদ জাহরা হাদ্দাদ আদেলের জানাজা হয়। আর তৃতীয় ধাপের জানাজা পড়া হয় শহীদ নেতার শিশু নাতনি জাহরা মোহাম্মদি গোলপায়েগানির জন্য।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন খামেনির ছেলে মাসউদ, মেইসাম ও মোস্তফা। আরও উপস্থিত ছিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপসের প্রধান জেনারেল আহমদ ভাহিদি এবং আইআরজিসির কুদস বাহিনীর প্রধান ইসমাইল কানি।
তবে খামেনির আরেক ছেলে এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর নির্দেশে ২৮ ফেব্রুয়ারি যে হামলায় তার বাবাকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তিনিও আহত হওয়ার পর আত্মগোপনে রয়েছেন। তা ছাড়া ইসরায়েল তাকেও হত্যার হুমকি দেওয়ায় ইরানের শীর্ষনেতাদের সম্মিলিত সিদ্ধান্তে তাকে লোকচক্ষুর আড়ালে রাখা হয়েছে।
গতকালের জানাজায় আগের দিনের তুলনায় অনেক বড় জনসমাগম হয়। কালো পোশাক পরা শোকাহত মানুষ লাল ব্যানার ও পতাকা হাতে নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে আসেন। সেসব ব্যানারে খামেনির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে হত্যার আহ্বানও ছিল। এর আগে ২০২০ সালে ট্রাম্পের নির্দেশে কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করেছিল ইরান। সে সময় ট্রাম্প প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। এরপর থেকেই ইরানের পক্ষ থেকে ক্ষোভ বাড়ছে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।
এদিকে যে সময় ট্রাম্পের মৃত্যু কামনা করে ইরানে স্লোগান চলছিল, সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ওয়াশিংটনে ভাষণ দিচ্ছিলেন ট্রাম্প। সেই ভাষণে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বললেন, ‘আমরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছি। ভেনেজুয়েলাকে দেখুন, ইরানকে দেখুন। আমরা তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছি, তাদের সামরিক বাহিনীকে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছি।’
যুদ্ধ চলাকালেও ট্রাম্প বিভিন্ন সময় ইরানের সভ্যতাকেই ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকিসহ নানা কঠোর বক্তব্য দিয়েছিলেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধের শুরুতে বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। কয়েক দশক ধরে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জানাজা শেষে খামেনির মরদেহ ইরানের বিভিন্ন শহর এবং প্রতিবেশী ইরাকেও নিয়ে যাওয়া হবে। প্রকাশিত সূচি অনুযায়ী, রাজধানী তেহরানে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর ৭ জুলাই ইরাকের ধর্মীয় নগরী কোমে বিশেষ শোক অনুষ্ঠান করা হবে। তেহরান, কোম, ইরাক ও মাশহাদে পাঁচ দিনব্যাপী খামেনির জানাজা এবং দাফন-সংক্রান্ত বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতা শেষে ৯ জুলাই তার জন্মশহর মাশহাদে দাফন করা হবে তাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, তার এই জানাজার রাষ্ট্রীয় আয়োজন দেশটির ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এবং নতুন সর্বোচ্চ নেতার অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করতে পারে।
তেহরান মেট্রোতে রেকর্ড ৭০ লাখ মানুষের যাতায়াত : ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ৭০ লাখের বেশি মানুষ তেহরান মেট্রোতে চলাচল করেছেন। তেহরানের মেট্রো নেটওয়ার্কের তথ্যানুযায়ী, স্থানীয় সময় গত শনিবার বিকাল ৫টা ৩০ মিনিট থেকে গতকাল সকাল ৭টা পর্যন্ত ৭০ লাখেরও বেশি যাত্রী যাতায়াত করেছেন। এক দিনে এটি রেকর্ড মানুষের ভ্রমণ। দেশটির আধাসরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান সরকার জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছানোর জন্য মেট্রো ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল। রবিবার রাত ৮টা পর্যন্ত মেট্রো সার্ভিস চলমান থাকবে।




