যুক্তরাষ্ট্রের পাম্পে বাড়তি বিল, রিফাইনারিতে পাঁচ গুণ মুনাফা
- ডিজেলের দামে রেকর্ড চাপ
- ১০ কোটি ব্যারেল মজুত ছাড়ছে জি-৭

ফাইল ছবি
একদিকে পাম্পে ডিজেলের দাম আকাশছোঁয়া। ট্রাকিং, কৃষি ও উৎপাদন খাতে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়। অন্যদিকে সেই একই বাজারে মার্কিন রিফাইনারিগুলোর মুনাফা লাফিয়ে বাড়ার সম্ভাবনা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটে তৈরি এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্বাধীন রিফাইনারিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় পাঁচ গুণ হওয়ার পূর্বাভাস এসেছে।
বাজারের চাপ এতটাই বেড়েছে যে শুক্রবার জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে জি-৭। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও জাপানসহ জোটটি আগামী চার মাসে জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি বাজারে ছাড়বে। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে আনার কথা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে শুক্রবার জাতীয়ভাবে ডিজেলের গড় দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৬.৩৭ ডলার। ২২ সেপ্টেম্বর তা রেকর্ড ৬.৫২ ডলারে উঠেছিল। ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে ডিজেলের দাম বেড়েছে ২.৫০ ডলারেরও বেশি।
এর সরাসরি চাপ পড়ছে পরিবহন ও ব্যবসায়। ট্রাকিং কোম্পানির খরচ বাড়ছে। কৃষকদের যন্ত্রপাতি চালাতে বেশি অর্থ গুনতে হচ্ছে। নির্মাণ ও উৎপাদন খাতেও বাড়ছে ডিজেলনির্ভর যন্ত্রপাতির পরিচালন ব্যয়। শেষ পর্যন্ত এসব বাড়তি ব্যয়ের একটি অংশ পণ্য ও সেবার দামে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে।
পাম্পে চাপ, রিফাইনারিতে মুনাফার জোয়ার
সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে রিফাইনারি খাতে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ স্বাধীন রিফাইনারিগুলো পরবর্তী দুই প্রান্তিকে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৩২.৪ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করতে পারে। এক বছর আগে একই সময়ে তাদের মুনাফা ছিল প্রায় ৬.৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সম্ভাব্য মুনাফা প্রায় পাঁচ গুণ।
ম্যারাথন পেট্রোলিয়াম, ভালেরো এনার্জি ও ফিলিপস ৬৬-এর মতো বড় প্রতিষ্ঠান এই হিসাবের মধ্যে রয়েছে। তাদের সম্মিলিত রাজস্ব প্রায় ৩২৫.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এর পেছনে বড় কারণ ‘ক্র্যাক স্প্রেড’। রিফাইনারিগুলো অপরিশোধিত তেল কিনে সেটি ডিজেল, পেট্রল ও অন্যান্য জ্বালানিতে পরিণত করে। অপরিশোধিত তেলের তুলনায় পরিশোধিত জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়লে এই ব্যবধান বা মার্জিনও বেড়ে যায়। বর্তমান বাজারে ঠিক সেটিই ঘটছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রিফাইনারি উৎপাদনও পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ দামের সুযোগ নেওয়ার পাশাপাশি উৎপাদনও বাড়াচ্ছে।
১০ কোটি ব্যারেল মজুত ছাড়ছে জি-৭
দাম কমাতে এখন বাজারে বাড়তি জ্বালানি ঢোকানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শুক্রবার জি-৭ নেতারা জানান, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে চার মাস ধরে জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও জ্বালানি ছাড়া হবে। ডিজেলকে দেওয়া হচ্ছে অগ্রাধিকার। প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই বড় পরিমাণ ডিজেল বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে জি-৭ দেশগুলো নিজেদের মধ্যে জ্বালানি রপ্তানিতে বাধা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে।
এই সিদ্ধান্তের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইউরোপীয় মিত্রদের জরুরি ডিজেল মজুত ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন প্রশাসন অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমাতে ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার সম্ভাবনাও বিবেচনা করেছিল।
তবে শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেবে না।
রপ্তানি বন্ধ করলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়তে পারত। কিন্তু ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি ছিল। শেষ পর্যন্ত জি-৭-এর মজুত ছাড়ার পথেই সমাধান খোঁজা হয়েছে।
তবে ১০ কোটি ব্যারেল বাজারে এলেই যে পাম্পের দাম দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অপরিশোধিত তেলকে ডিজেলে রূপান্তর করতে রিফাইনারি সক্ষমতা, পরিবহন ব্যবস্থা ও তেলের ধরন—সবকিছুর ওপর সরবরাহের গতি নির্ভর করবে।
অর্থাৎ জ্বালানি ব্যয় যখন ব্যবসা ও ভোক্তার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন চাকরি তৈরির গতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
দাম স্বাভাবিক হতে লাগতে পারে এক বছরের বেশি
জ্বালানি বাজারের চাপ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও পরিষ্কার নয়।
সেপ্টেম্বরের ডালাস ফেডের জ্বালানি খাতের জরিপে তেল ও গ্যাস খাতের প্রায় অর্ধেক নির্বাহী বলেছেন, ডিজেলের দাম ২০২৫ সালের স্তরের দিকে ফিরতে চার প্রান্তিকের বেশি সময় লাগতে পারে। জরিপে ৪৮ শতাংশ অংশগ্রহণকারী ডিজেলের ক্ষেত্রে এক বছরের বেশি সময়ের কথা বলেছেন।
একই জরিপে অনেক নির্বাহী পারস্য উপসাগর থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি স্বাভাবিক হতেও ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে এখন তৈরি হয়েছে দ্বিমুখী চাপ। পাম্পে সাধারণ ভোক্তার বিল বাড়ছে। পরিবহন ও উৎপাদন খাতের খরচ বাড়ছে। চাকরির বাজারও দুর্বল হচ্ছে। আর সেই একই সময়ে উচ্চ পরিশোধিত জ্বালানির দাম ও বড় ক্র্যাক স্প্রেড রিফাইনারিগুলোর মুনাফা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
জি-৭-এর ১০ কোটি ব্যারেল মজুত ছাড়ার উদ্যোগে বাজার কিছুটা স্বস্তি পায় কি না, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘ হলে সরবরাহের চাপও দীর্ঘ হতে পারে। তখন পাম্পের বাড়তি বিল আর রিফাইনারির বাড়তি মুনাফার এই বৈপরীত্য আরও কিছুদিন মার্কিন অর্থনীতির বড় বাস্তবতা হয়ে থাকতে পারে।
সূত্র: ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরো, ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ এবং জি-৭ নেতাদের বিবৃতি



