বিদায় খামেনি, অম্লান খামেনি

কোটি কোটি মানুষের অশ্রুজলে ভেসে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনি। ছবি: আল-জাজিরা
‘বিপ্লবীর মৃত্যু নেই। বিপ্লব মরে না। আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিও মরেননি। তিনি অমর। অম্লান হয়ে থাকবেন ইরানের ঘরে ঘরে। চোখের জলে, স্মৃতির সিন্দুকে। শোক-আহাজারি, গর্জন-হুংকারে।’ জাতির প্রাণপুরুষ, সর্বোচ্চ নেতার বিদায়বেলায় বিপ্লবী সেই আগুনই ফুলকি হয়ে উড়ছে ইরানের শোকাতুর আকাশে। সাম্রাজ্যবাদের ভিত কাঁপিয়ে মাটির ঘরে ঠাঁই নিয়েছে পারস্যের সূর্য। তেহরানের রাজপথ থেকে শুরু করে ইরাকের কারবালার ধূলিকণা হয়ে মাশহাদের দিগন্তে জনসমুদ্রের গর্জন উঠেছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। তা কোনো সাধারণ শোক ছিল না। ছিল এক অদম্য চেতনার পুনর্জন্ম। কালো পোশাকের সেই ক্রন্দনরত জনতা যেন চিৎকার করে বিশ্বকে জানিয়ে দিল— ব্যক্তি খামেনির বিদায় ঘটেছে সত্য, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের শৃঙ্খল ভাঙার যে মন্ত্র তিনি ফুঁকে দিয়ে গেছেন, তা টগবগ করে ফুটবে ইরানের প্রতিটি ধমনিতে।
আদর্শের সূর্য ডোবে না। গত শুক্রবার থেকে শুরু হওয়া সাত দিনের শোক অনুষ্ঠান আর শেষ শয্যার মহামিছিলে সেই সত্যও আরেকবার প্রতিষ্ঠিত হলো ইরানে। বিদায়ের শেষযাত্রার মিছিলেও জাগিয়ে গেলেন জাতিকে। গতকাল কোটি কোটি মানুষের অশ্রুজলে ভেসে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন শহীদ আয়াতুল্লাহ খামেনি। জন্মশহর মাশহাদে ইমাম রেজার (আ.) রওজা মোবারকের নিকটবর্তী ‘দারুজ জিকর রওয়া’ প্রাঙ্গণে দাফন করা হয় সর্বোচ্চ নেতা ও তার পরিবারের সদস্যদের। প্রিয় নেতাকে শেষবারের মতো ছুঁয়ে দেখতে ছুটে আসা লাখ লাখ ভক্তের কারণে নির্ধারিত সময়ে জানাজা ও দাফন স্থানে পৌঁছাতে বিলম্ব হয় খামেনির ‘শেষ কাফেলা’র। পূর্ব সময়সূচি রাত ৮টায় জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও তা গড়িয়ে দাঁড়ায় ৯টা ৫৩ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১২টা ২৩ মিনিট)। শুরুতে শিয়াবিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী ও প্রবীণ ধর্মীয় পণ্ডিত ১০১ বছর বয়সী ইমাম গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হোসেইন নুরি হামেদানির জানাজা পড়ানোর কথা থাকলেও শেষ সময়ে তা পাল্টে যায়। জানাজা পড়ান বড় ছেলে মোস্তফা খামেনি। এরপর পূর্ণ মর্যাদায় দাফন। এ সময় একযোগে বিশেষ ‘নামাজ-এ লাইলাতুলদাফন’ (দাফনের রাতের বিশেষ নামাজ) আদায় করে পুরো ইরান। এর মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এক শোকাবহ অধ্যায়ের চূড়ান্ত সমাপ্তি ঘটল মাশহাদে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বর্বর হামলায় ২৮ ফেব্রুয়ারি নিজ কার্যালয় ও বাসভবনে নিহত হন খামেনি (৮৬)।
শোকের সাগর মাশহাদ
বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মুসলমান ও স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রিয় নেতার চিরবিদায়ের এই মুহূর্তটি ঘিরে শোকের সাগরে পরিণত হয় মাশহাদ। গতকাল সকাল থেকে শহরের সড়কগুলোয় তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। জানাজাবিষয়ক প্রেস ব্রিফিংয়ে মাজারের তথ্য ও গণমাধ্যম বিভাগের প্রধান হুজ্জাতুল ইসলাম মোসলেম হুশাঙ্গি বললেন, বর্তমানে অষ্টম ইমাম হজরত ইমাম রেজার (আ.) পবিত্র রওজা প্রাঙ্গণ এবং এর চারপাশের প্রতিটি সংযোগকারী সড়ক দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখো জিয়ারতকারী, মুজাবির এবং স্থানীয় শোকার্ত মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে। শহীদ নেতা, যিনি নিজেকে সবসময় ‘খাদেমুর রেজা’ বা ইমাম রেজার সেবক হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং তার আদর্শের প্রতি আনুগত্য পুনর্নবীকরণের জন্য মানুষের এই যে অভূতপূর্ব ও মহাসমুদ্রের মতো ঢল নেমেছে, তা আমাদের সাধারণ মানুষের কাছে কল্পনাতীত।
তিনি আরও জানিয়েছেন, শুধু ইরানের নাগরিকরাই নন, বরং বিশ্বের অন্তত ২৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, কূটনীতিক ও বিশেষ প্রতিনিধিদল এই দাফন ও জানাজা অনুষ্ঠানে সরাসরি অংশ নিতে মাশহাদ শহরে অবস্থান করছেন। ভিড়ের তীব্রতা এবং মানুষের আবেগের চাপ এতটাই বেশি যে, রওজার আশপাশের সব সড়ক, আন্ডারপাস এবং বিশাল পার্কিংগুলো সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও স্থবির হয়ে পড়েছে।
বিমানবন্দর থেকে হারাম (রওজা) অভিমুখে শেষযাত্রা
পবিত্র নগরী মাশহাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শহীদদের মরদেহ বহনকারী বিশেষ বিমানটি অবতরণের পর সেখানে এক রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এরপর শহীদদের মরদেহ মাশহাদের প্রধান সড়ক ‘ইমাম রেজা (আ.) অ্যাভিনিউ’য়ে নিয়ে আসা হয়। সেখান থেকে ‘১৫ খোরদাদ স্কয়ার’ (ফালাক-এ জেহাদ) থেকে পবিত্র রওজা অভিমুখে এক ঐতিহাসিক ও বিশাল শোকযাত্রা শুরু হয়। লাখ লাখ মানুষের বুকফাটা কান্না আর স্লোগানের মধ্য দিয়ে মরদেহবাহী গাড়িটি ইমাম রেজার মাজার শরিফের দিকে অগ্রসর হয়।






