ধর্ম অবমাননার অভিযোগ
গড়কাটি গ্রামে মিছিল নিয়ে হামলা, ছিল ‘অচেনা মুখ’

হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ সার্বজনীন মন্দির ও নাটমন্দির। ছবি: সংগৃহীত
ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার গড়কাটি গ্রামে হয়েছে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট। দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এলাকায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের অনেকেই বিস্মিত। তাদের ভাষ্য, মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এলাকার বাইরের লোকজনও ছিল। অনেক মুখই তাদের কাছে মনে হয়েছে অপরিচিত। এমন সহিংসতার পেছনে ভিন্ন উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলেও মনে করছেন স্থানীয়দের অনেকে।
অভিযুক্ত সুদীপ্ত রায়ের বাবা নিখিল রায় জানান, তিনি ফেসবুক ব্যবহার করেন না। ছেলের একটি মন্তব্য নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার খবর পেয়ে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের পরামর্শে বিষয়টি মীমাংসার জন্য গত ২৩ জুন ছেলেকে নিয়ে যান বাদাঘাট বাজারে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারে যাওয়ার পর ছেলেকে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল উত্তেজিত জনতা। তখন একটি দোকানে আশ্রয় নিই।’
সেই দোকানটি স্থানীয় ব্যবসায়ী মুক্তার হোসেনের। সুদীপ্তকে রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। জানান, এলাকার কয়েকজনের পরামর্শেই তার দোকানের সামনে আসেন নিখিল রায়। পরে উত্তেজিত লোকজন সেখানে এসে সুদীপ্তকে তুলে নিতে চায়। তিনি তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে দোকানের শাটার বন্ধ করে সুদীপ্তকে ভেতরে নিরাপদে রাখেন। পরে বাজার কমিটির সদস্যদের সহায়তায় তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সুদীপ্ত রায়কে পুলিশ নিরাপদে থানায় নিয়ে যাওয়ার পরপরই বাদাঘাট বাজার থেকে কয়েকশ মানুষ মিছিল নিয়ে গড়কাটি গ্রামের দিকে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপরই শুরু হয় একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট।
সুদীপ্তর চাচা দিলীপ রায় জানান, সেদিন মিছিল থেকে আসা লোকজন তিন দফায় তাদের বাড়িতে হামলা চালায়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মারধর করা হয়েছে বাদাঘাট বাজারে তাদের স্বজন অরুণ রায় ও তার ছেলে রঙ্গন রায়কে। পাশাপাশি কয়েকটি দোকানেও চালানো হয় ভাঙচুরের চেষ্টা।
কান্নাভেজা চোখে সুদীপ্তর মা কেতকী রায় বলেন, ‘আমার বাড়িঘরের সবকিছু ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘরের জিনিসপত্র নিয়ে গেছে। টাকা-পয়সা ছিল, স্বর্ণ ছিল, সব নিয়ে গেছে।’
হামলার সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় গড়কাটি গ্রামের সার্বজনীন মন্দির। সুদীপ্ত রায়ের বাড়ির পেছনে অবস্থিত মন্দির প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া নাটমন্দির। স্থানীয়দের ভাষ্য, পাথর ভাঙার কাজে ব্যবহৃত বড় হাতুড়ি দিয়ে স্তম্ভ ভেঙে ফেলা হয়। ফলে টিনের ছাউনি মাটিতে ধসে পড়ে।
গড়কাটি উত্তরপাড়া সার্বজনীন মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুব্রত রায় সুমন বলেন, ‘সুদীপ্তকে পুলিশ নিয়ে যাওয়ার পর, ফেসবুকে প্রচার ও মাইকিং করে লোকজনকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পরে উত্তেজিত জনতা সুদীপ্তকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে তার বাড়িতে হামলা চালায়। একপর্যায়ে পাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। যদিও স্থানীয় কিছু মানুষের চেষ্টায় আরও বড় ক্ষয়ক্ষতি ঠেকানো সম্ভব হয়।"
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে সুদীপ্তর বাড়িতে হামলা হয়। এরপর গ্রামের কালীমন্দির, দুর্গামন্দির ও নাটমন্দিরে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়। মন্দিরের মূল্যবান সামগ্রী এবং ভক্তদের বসার আসবাবও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’
এদিকে সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা মামলায় সুদীপ্ত রায় বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এবারের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিলেন তিনি। পরিবারের আবেদন সত্ত্বেও জনরোষের আশঙ্কায় তাকে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ভয় ছিল, সুযোগ পেলে আক্রমণ করা হতে পারে।
হামলার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার এবং স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ বছর ধরে এই অঞ্চলের মন্দিরে দুর্গাপূজার সময় আসি। এখানে হিন্দু-মুসলিম সবাই মিলেই উৎসব পালন করেন। আমরা আগের সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশেই থাকতে চাই।’
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ জানান, সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা হয়েছে সুদীপ্তর বিরুদ্ধে। তবে বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি।
ঘটনার দুই সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনার নেপথ্যে কারা ছিল এবং কী উদ্দেশ্যে হামলা চালানো হয়েছে, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচনের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।




