সৌদির বিমানঘাঁটিতে হুতিদের নতুন হামলা, আহত কমপক্ষে ১৩

সৌদি আরবের খামিস মুশাইত শহরের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে হুতিদের ড্রোন হামলার দৃশ্য। ফাইল ছবি / রয়টার্স
ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা সৌদি আরবে নতুন করে হামলা চালিয়েছে। তারা দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত এলাকায় একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতে কয়েক ডজন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা করে। এতে কমপক্ষে ১৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন।
হুতিরা সোমবার জানিয়েছে, তারা সামরিক ঘাঁটিতে বিমান রাখার হ্যাঙ্গার, রাডার ব্যবস্থা, রানওয়ে ও গোলাবারুদের গুদাম লক্ষ্য করে এসব হামলা চালিয়েছে।
দেশটির সৌদি-সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের কর্মকর্তারা আহতের তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ খামিস মুশাইতসহ দক্ষিণাঞ্চলের আরও তিনটি শহরে জরুরি সতর্কতা জারি করেছে।
একই সময়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করছে হুতিরা। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে পেরিম দ্বীপও দখল করেছে তারা। এর ফলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।
হুতিদের দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার জবাবে কী করা হবে, তা নিয়ে সৌদি আরবে জরুরি আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রসঙ্গে ইরান ও উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর মধ্যে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হয়েছে।
হুতিদের হামলার জবাবে সৌদি ও ইয়েমেনি বিমানবাহিনীও অভিযান বাড়িয়েছে। লোহিত সাগরের ঐতিহাসিক বন্দর মোচা এলাকাসহ হুতিদের বিভিন্ন অবস্থানে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
তবে ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তারা বলেছেন, লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় পুরো এলাকাতেই হুতিরা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
এক ইয়েমেনি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হুতিদের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। তারাও সৌদির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযান আরও জোরদার করছে তারা।’
এতে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিমান হামলায় সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। রিয়াদ এর জন্য ইরানপন্থী ইরাকি মিলিশিয়াদের দায়ী করেছে।
সৌদি আরব ১৯৮০-এর দশকে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইন নির্মাণ করে। পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত এই পাইপলাইন গেছে। ওই সময় ইরান-ইরাক যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় উপসাগরীয় পথ এড়িয়ে তেল পরিবহনের জন্য পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছিল।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, সৌদি পাইপলাইনটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্বে তেল সরবরাহ ৪ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি যখন প্রায় অবরুদ্ধ, তখন এর প্রভাব আরও বড় হতে পারে। তবে পাইপলাইনের কার্যক্রম কবে শুরু হবে, তা সৌদি আরব জানায়নি।
সোমবার অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ৪ শতাংশের বেশি বেড়েছিল। পরে তা প্রায় ১ শতাংশ বেশি দামে স্থির হয়।
ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়া মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, সৌদি আরব সরাসরি সামরিক সহায়তা চাইলেও এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা সহায়তার বাইরে যুদ্ধে সরাসরি জড়াতে রাজি হয়নি।
ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, তিনি সৌদি যুবরাজের সঙ্গে কথা বলেছেন। হুতিরাও ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে বাইরে থাকার অনুরোধ করেছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সৌদি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সোমবার জেদ্দায় মার্কিন আঞ্চলিক কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি জোট হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুদ্ধবিরতির কারণে সংঘাত অনেকটাই কমে এসেছিল।
তবে চলতি মাসে আবার লড়াই শুরু হয়েছে। হুতিরা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সমর্থক বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
এদিকে, হরমুজ নিয়ে কূটনৈতিক উদ্যোগও থমকে গেছে। প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনার জন্য সোমবার ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ওমানে একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে যেত।
তবে ওমান জানিয়েছে, বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। ইরান বলেছে, সৌদি আরবের অনুরোধেই বৈঠক স্থগিত হয়েছে।
ট্রাম্প সোমবার আবারও বলেছেন, ইরান দ্রুত একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ি এই বক্তব্যকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা বলেছেন।
সামাজিকমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘ইরানের শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনা নয়।’
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে একটি তেলবাহী জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া গেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি) বলেছে, পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ এল গাইয়া নিষিদ্ধ এলাকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সমুদ্রের মাইনে আঘাত পেয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড তাৎক্ষণিকভাবে এই দাবি অস্বীকার করেছে। তারা বলেছে, গত মাসে ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজটি অচল হয়ে যায়।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা জানিয়েছে, শনিবার এল গাইয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কীভাবে জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা তারা জানায়নি। সংস্থাটি বলেছে, জাহাজটির দুই নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।
জাহাজটির দুবাইভিত্তিক মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এসব তথ্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ এই তেল পরিবহনপথ প্রায় বন্ধ রয়েছে। ইরান তাদের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোকে হুমকি দিয়ে আসছে।
সূত্র : রয়টার্স




