জন্মহার বাড়াতে সন্তান জন্মে বেতনসহ ছুটি বাড়াল ফ্রান্স

ফ্রান্সে কমছে জন্মহার, বাড়াতে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। ছবি: সংগৃহীত
কমে আসা জন্মহার মোকাবিলা এবং পরিবারগুলোকে সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে নতুন বেতনসহ জন্ম-ছুটির নীতি কার্যকর করেছে ফ্রান্স।
বুধবার থেকে কার্যকর হওয়া এ নীতির আওতায় চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বা তার পর জন্ম নেওয়া কিংবা দত্তক নেওয়া শিশুর বাবা ও মা অতিরিক্ত এক থেকে দুই মাস পর্যন্ত পাবেন বেতনসহ ছুটি।
ফরাসি সরকারের আশা, নতুন এই পারিবারিক ও অর্থনৈতিক প্রণোদনা জন্মহার বৃদ্ধির পাশাপাশি ভবিষ্যতের শ্রমবাজার, সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য রক্ষায় রাখবে ইতিবাচক ভূমিকা।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, বিদ্যমান মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অতিরিক্ত এই ছুটি ভোগ করতে পারবেন অভিভাবকেরা। ছুটির প্রথম মাসে তাদের মূল বেতনের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং দ্বিতীয় মাসে প্রায় ৬০ শতাংশ ভাতা দেওয়া হবে। এই অর্থ আসবে সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তা তহবিল থেকে। তবে উচ্চ আয়ের কর্মীদের ক্ষেত্রে ভাতার একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে রাষ্ট্রীয় তহবিলের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
এই সুবিধা মূলত কর্মজীবী এবং সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলে নিয়মিত অবদান রাখা অভিভাবকদের জন্য প্রযোজ্য। সরকারি ও বেসরকারি খাতের স্থায়ী এবং অস্থায়ী কর্মীরা নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলেই পাবেন এই ছুটি। তবে যেসব পরিবারে স্বামী-স্ত্রী কেউই কর্মজীবী নন, তারা এই ছুটি বা ভাতা পাবেন না। যদিও নির্ধারিত আয়ের নিচে থাকা পরিবারগুলো শিশুর জন্য প্রচলিত এককালীন জন্ম অনুদান এবং মাসিক পারিবারিক ভাতাসহ অন্যান্য সরকারি সহায়তা থাকবে আগের মতোই।
ফ্রান্সের সমাজকল্যাণ ও পরিবারবিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সন্তানের জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস শিশু ও পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে মা ও বাবা কর্মক্ষেত্রের চাপ থেকে মুক্ত থেকে শিশুর সঙ্গে বেশি সময় কাটাতে পারলে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে প্রসবের পর মায়ের সুস্থতা ফিরে পাওয়া এবং বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ পারিবারিক বন্ধন আরও শক্তিশালী করে। কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এই আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এর আগেও ফ্রান্সে পরিবারবান্ধব বেশ কয়েকটি সুবিধা চালু ছিল। কর্মজীবী মায়েরা সাধারণত প্রায় ১৬ সপ্তাহ পর্যন্ত পূর্ণ বা আংশিক বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পান। বাবারা রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে প্রায় ২৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটির পাশাপাশি অতিরিক্ত জন্ম-ছুটিও ভোগ করতে পারেন। এ ছাড়া নির্ধারিত আয়ের নিচে থাকা পরিবারগুলো শিশুর জন্মের সময় এককালীন আর্থিক অনুদান, মাসিক পারিবারিক ভাতা এবং শিশুর পরিচর্যার জন্য পেয়ে থাকে সরকারি ভর্তুকি।
জনসংখ্যা ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, ফ্রান্সে জন্মহার কমে যাওয়ার পেছনে উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, মানসম্মত শিশুযত্নের উচ্চ খরচ এবং তরুণদের মধ্যে দেরিতে পরিবার গঠনের প্রবণতাসহ রয়েছে একাধিক কারণ। সরকারের নতুন উদ্যোগকে তারা স্বাগত জানালেও মন্তব্য করেছেন, শুধু ছুটি বা সাময়িক আর্থিক সহায়তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে জন্মহারের সংকট কাটানো সম্ভব নয়। তাদের মতে, জন্মহার বাড়াতে সাশ্রয়ী আবাসন, সহজলভ্য শিশুযত্ন, তরুণদের জন্য স্থিতিশীল কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নিম্ন জন্মহার ও বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির চ্যালেঞ্জ এখন পুরো ইউরোপজুড়েই দেখা দিয়েছে। জার্মানি, ইতালি ও স্পেনও জনসংখ্যার ভারসাম্য ধরে রাখতে বিভিন্ন পরিবারবান্ধব নীতি ও আর্থিক প্রণোদনা চালু করেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ফ্রান্সের নতুন জন্ম-ছুটি নীতি ভবিষ্যতে অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের জন্যও একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।




