খাদ্য ও আশ্রয়ের লড়াইয়ে দিশেহারা ভেনেজুয়েলাবাসী
- ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে পাঁচ লক্ষ মানুষ, পাশে দাঁড়াবে জাতিসংঘ

ভূমিকম্পের আঘাতে লণ্ডভণ্ড ভেনেজুয়লা, চলছে উদ্ধারের কাজ। ছবি: সংগৃহীত
ভূমিকম্পের অভিঘাত কেবল কয়েক মুহূর্তের। কিন্তু তার ক্ষতচিহ্ন বহন করতে হয় বহুদিন। ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি, ছিন্নভিন্ন জনপদ, স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ এবং অনিশ্চয়তায় ভরা ভবিষ্যৎ- ভেনেজুয়েলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এখন এই বাস্তবতাই চোখে পড়ছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে ৫ লাখ মানুষ। এক বেলার খাবার আর মাথা গোজার ঠিকানার লড়েইয়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছে সবহারানো এই অসহায় মানুষগুলো। ঠিক এমন এক মুহুর্তেই তাদের পাশে দাঁড়ানোর বড় উদ্যোগের কথা জানাল জাতিসংঘ।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত আশ্রয়কেন্দ্রগুলিতে থাকা প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষকে মানবিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
২৪ জুনের বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যেই একটি বিশেষ ত্রাণ পরিকল্পনা কার্যকর করেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থার ভেনেজুয়েলা প্রধান স্টেফানি হখস্টেটার এক ভার্চুয়াল বৈশ্বিক সংবাদ সম্মেলনে জানান, জরুরি পুষ্টি সহায়তার প্যাকেট বিতরণ শুরু হয়ে গেছে। একই সঙ্গে আগামী কয়েক মাসের ত্রাণ সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ৫ কোটি ডলার অর্থসাহায্যের আবেদন জানানো হয়েছে।
তবে হখস্টেটার সতর্ক করে দিয়েছেন, এই অর্থও বিপর্যয়ের সম্পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট হবে না। বিশেষ করে দেশের উত্তর উপকূলীয় অঞ্চলে যে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, তার পরিমাণ এতটাই বড় যে প্রয়োজনীয় সহায়তার পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত।
ডব্লিউএফপির প্রাথমিক সহায়তা ইতিমধ্যে সরাসরি প্রায় ১,২০০ ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে। কিন্তু সংস্থার ধারণা, আগামী দিনে এই সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়বে। বর্তমানে তাদের কাছে ৩,০০০ মেট্রিক টন খাদ্য মজুত রয়েছে, যা জরুরি ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এই খাদ্যসামগ্রী টানা দুই মাসের জন্য ১০ হাজারেরও বেশি পরিবারের ন্যূনতম খাদ্যচাহিদা পূরণ করতে সক্ষম বলে জানানো হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে লা গুয়াইরা অঞ্চলে। ভেনেজুয়েলা সরকারের সমন্বিত সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এই অঞ্চলই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা। সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ১,৯৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১০,৫০০ জনেরও বেশি মানুষ।
ত্রাণ কার্যক্রমে দুটি ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে জাতিসংঘ। একদিকে অতিরিক্ত ভিড়ের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সরাসরি প্রস্তুত খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব পরিবার নিজ নিজ ঘরে অবস্থান করলেও অর্থনৈতিক বা শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে বাজার থেকে প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করতে পারছে না, তাদের কাছে খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।
হখস্টেটার বলেন, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানীয় জল, আশ্রয় এবং মৌলিক পরিষেবার প্রয়োজন এখন অত্যন্ত জরুরি। তার কথায়, বহু পরিবার আগে থেকেই দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের সঙ্গে লড়াই করছিল। ভূমিকম্পের ফলে তাদের জীবিকার উৎস ধ্বংস হয়েছে, অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেকেই আরও গভীর সংকটের মুখে পড়েছেন।
ত্রাণ সরবরাহের গতি বাড়াতে স্থানীয় বাজার থেকেও সরাসরি পণ্য কিনছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি। এর ফলে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত খাদ্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবহণ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপও কমানো যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিবেশী কলম্বিয়ায় সংরক্ষিত জরুরি খাদ্য মজুতের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সমন্বয় রাখা হচ্ছে, যাতে পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে দ্রুত অতিরিক্ত সহায়তা পাঠানো যায়।
জাতিসংঘ বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ ও উপকূলীয় অঞ্চলগুলির পরিস্থিতি নিয়ে। সংস্থার আশঙ্কা, ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকাগুলিতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি সামনে আসেনি। বিশেষ করে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার যুগপৎ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত বহু এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সড়ক ও স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সেখানে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।
হখস্টেটার জানান, লা গুয়াইরায় যে কেন্দ্র থেকে পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও ত্রাণ সমন্বয়ের কাজ চলছে, সেটি ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের প্রশাসনের বিশেষ অনুরোধে গড়ে তোলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ভেনেজুয়েলা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় এবং জাতিসংঘের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রয়েছে, যাতে মানবিক সহায়তা দ্রুত ও নিরাপদভাবে দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে সময় লাগবে। নতুন করে ঘরবাড়ি গড়ে তুলতেও লাগবে দীর্ঘ পথচলা। কিন্তু সেই দীর্ঘ পুনর্গঠনের আগে সবচেয়ে জরুরি লড়াইটি হল চে থাকার লড়াই। আর সেই লড়াইয়ে লাখো লাখো মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাতিসংঘ। ভেঙে পড়া জীবনের ভস্মস্তূপের মধ্যেও তাই এখনো জেগে রয়েছে একটুখানি আশার আলো।
অনুবাদ: রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি





