ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প
মাত্র ৬০ সেকেন্ডেই ধূলিসাৎ ১১ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ
- ঘুরে দাঁড়াতে লাগবে কয়েক দশক, কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ
- চুক্তি সচল থাকলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বীমা দাবির ঘটনা হবে এ ভূমিকম্প

ভূমিকম্পে বিদ্ধস্ত ভেনেজুয়েলা। ছবি: সংগৃহীত
মানুষের তৈরি সভ্যতা যে কতটা ভঙ্গুর, আরও একবার যেন সেই চিরন্তন সত্যকেই সামনে আনলো ভেনেজুয়েলার এই সাম্প্রতিক ট্র্যাজেডি। জোড়া ভূমিকম্প। প্রথমটি ৭.২ মাত্রার। ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের। দ্বিতীয়টি ৭.৫ মাত্রার। সবচেয়ে বড় এ কম্পনটির স্থায়িত্ব ছিল প্রায় ১ মিনিট। দুই মিলে ৯০ সেকেন্ড। মাঝে ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধান। তাতেই ধুলোয় মিশে গেল আস্ত একটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, ‘সবচেয়ে ভয়ংকর কম্পনটিই ছিল পরেরটি। প্রায় ১১ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ ধূলিসাৎ হয়েছে ৬০ সেকেন্ডের ওই ভয়াবহ ভূমিকম্পে। কয়েক দশক লাগবে ঘুরে দাঁড়াতে।’
একই কথা বলছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফও। জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) উপগ্রহ-ভিত্তিক ‘র্যাপিড ডিজিটাল অ্যাসেসমেন্ট’ অনুযায়ী, আবাসন ও অর্থনৈতিক সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞের কারণে প্রত্যক্ষ ভৌত ক্ষতির পরিমাণ এখনই প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের জিডিপির প্রায় ৬ শতাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রয়েছে প্রায় ১৭ লাখ স্থাপনা।
ইউএসজিএস-এর মতে, অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দেশের জিডিপির ২% থেকে ১০%-এর সমান হতে পারে। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে এই ক্ষতি ১১ হাজার ১৩০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, মোট অর্থনৈতিক প্রভাব সাধারণত প্রত্যক্ষ ক্ষতির ১.৫ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত বেশি হয়। অবকাঠামোগত ক্ষতি, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন ব্যয়ের ফলে এই ক্ষতির অঙ্ক বাড়বে আরও বহুগুণ। ভেনেজুয়েলার সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে কোনো ‘প্যারামেট্রিক’ ভূমিকম্প বীমা কভারেজ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে সাধারণত এই ধরনের বীমাগুলো ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে কার্যকর হয়। যেহেতু এবারের ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৭.৫। সেক্ষেত্রে বীমা চুক্তি সচল থাকলে এটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বীমা দাবির ঘটনায় পরিণত হতে যাচ্ছে, যা প্রবলভাবে প্রভাবিত করবে আন্তর্জাতিক বীমা বাজারকেও।
বুধবার (২৪ জুন), স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিট। ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত ভেনেজুয়েলা তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহতম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। ভূতাত্ত্বিক পরিভাষায় ‘সিসমিক ডাবলেট’ বা জোড়া ভূমিকম্প নামে পরিচিত এই দুর্যোগের প্রথম আঘাতটি ছিল ৭.২ মাত্রার ‘ফোরশক’ (মূল ভূমিকম্পের আগের কম্পন)। এর পরপরই ভূগর্ভের মাত্র ১৩.২ কিলোমিটার গভীরে মন্টালবান এলাকায় আঘাত হানে ৭.৫ মাত্রার মূল বিনাশী ভূমিকম্প। এই ‘অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং’-এর তীব্র কম্পনে কেবল ভেনেজুয়েলাই নয়, কেঁপে উঠেছে পার্শ্ববর্তী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটাও।
ভেনেজুয়েলার এই জোড়া ভূমিকম্পের প্রকৃতি ২০২৩ সালে দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে আঘাত হানা প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। তুরস্কের সেই ঘটনায় ক্ষতি ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিল এবং ৫৯,০০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ৩ বছর পেরিয়ে ২০২৬ সালেও তুরস্ক যেখানে পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারেনি (তুরস্কের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৫.৪% থেকে কমে ৩.৪%-এ নেমে এসেছে), সেখানে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে আগে থেকেই ভঙ্গুর ভেনেজুয়েলার জন্য অদূর ভবিষ্যৎ আরও অন্ধকার হতে চলেছে।
জিডিপির ব্যাপক ধসের কারণে কর্মসংস্থান হারাবে লাখ লাখ মানুষ, যা দেশে চরম দারিদ্র্য ও মুদ্রাস্ফীতি ডেকে আনবে। সমমানের ভূমিকম্পের ইতিহাস বলে, ভেনেজুয়েলার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় মহামারি এবং তীব্র খাদ্য সংকটের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার জন্য এই ‘সিসমিক ডাবলেট’ এক ভয়াবহ অগ্নিপরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত, দীর্ঘমেয়াদি এবং কার্যকর মানবিক ও আর্থিক সহায়তা ছাড়া এই ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশের পক্ষে ধ্বংসস্তূপ থেকে আবার মাথা তুলে দাঁড়ানো প্রায় অসম্ভব।
অনুবাদ : সম্রাট চক্রবর্তী, সংবাদদাতা, দিল্লি




