রিভিউ
থ্রিলারের গণ্ডি পেরোনো ‘হেডলাইন’
- ‘হেডলাইন’ সিরিজে অপূর্ব ও ইয়াশ

‘হেডলাইন’ সিরিজে অপূর্ব ও ইয়াশ
দেশে থ্রিলারধর্মী ওয়েব সিরিজের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রহস্য, হত্যাকাণ্ড কিংবা ষড়যন্ত্রের ভেতরেই নির্মাতারা নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেন। সালেহ সোবহান অনীম পরিচালিত আট পর্বের ওয়েব সিরিজ ‘হেডলাইন’
একটি তদন্তমূলক সাংবাদিকতার গল্পকে কেন্দ্র করে নির্মিত। সংবাদমাধ্যম, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো এবং ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংঘাত নিয়ে নির্মিত একটি রাজনৈতিক-সামাজিক ড্রামা সিরিজ এটি। গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে তরুণ সাংবাদিক সামিউল, যার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন নিজের নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করা। সেই আকাঙ্ক্ষাই তাকে জড়িয়ে ফেলে এক ভয়ংকর অনুসন্ধানে। অভিজ্ঞ সাংবাদিক জহির আহমেদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হয়, যেখানে সত্য উদ্ঘাটনের পথ কেবল তথ্য সংগ্রহের নয়; বরং ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোরও।
সিরিজটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর চিত্রনাট্য। সৈয়দ আহমেদ শাওকী ও আয়মান আসিব স্বাধীনের লেখায় সংলাপ কখনো অযথা ভারী হয়ে ওঠে না, আবার প্রয়োজনীয় জায়গায় সূক্ষ্ম রাজনৈতিক ইঙ্গিত, ব্যঙ্গ এবং রূপকের ব্যবহার গল্পকে আরও অর্থবহ করে তোলে। বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের যেমন দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে, তেমনি হিউমার ও মানবিক সম্পর্কের মুহূর্তগুলো গল্পকে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য দেয়।
অভিনয়ের ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উজ্জ্বল ইয়াশ রোহান। সামিউলের কৌতূহল, অস্থিরতা, আদর্শবাদ এবং সাংবাদিক হয়ে ওঠার সংগ্রামকে তিনি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে পর্দায় তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে, অভিজ্ঞ সাংবাদিক জহির আহমেদ চরিত্রে জিয়াউল ফারুক অপূর্ব দীর্ঘদিনের অভিনয় অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়েছেন। সংযত অভিব্যক্তি, আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি এবং সংলাপ বলার ভঙ্গিতে তিনি চরিত্রটিকে দৃঢ় ভিত্তি দিয়েছেন।
অপূর্ব ও ইয়াশ রোহানের রসায়ন সিরিজটির অন্যতম আকর্ষণ। একজন অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী আর একজন শেখার পথে থাকা তরুণ সাংবাদিক— তাদের সম্পর্কের বিকাশ অনেকটাই মনে করিয়ে দেয় জনপ্রিয় অনুসন্ধানী জুটি ফেলুদা ও তোপসের পারস্পরিক নির্ভরতার কথা।
বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপের যেমন দর্শককে ভাবতে বাধ্য করে তেমনি হিউমার ও মানবিক সম্পর্কের মুহূর্তগুলো গল্পকে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য দেয়
সত্য অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী আইরিন চরিত্রে আফসান আরা বিন্দু ছিলেন অনবদ্য। তার অভিনয়ে দৃঢ়তা ও সংযম চরিত্রটিকে আলাদা গুরুত্ব দিয়েছে। দোলন চরিত্রে সারিকার সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিও চোখ এড়ায় না।
একইভাবে শিশু শিল্পী রাই রাজন্যা ও অর্নীল বিরল স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে গল্পে প্রাণ সঞ্চার করেছে। তাদের কমিক টাইমিং এবং সহজাত অভিনয় আনন্দদায়ক।
সিরিজটির অন্যতম বড় চমক হিসেবে ক্লাইম্যাক্সে হাজির হন চঞ্চল চৌধুরী। অল্প সময়ের উপস্থিতিতেই তিনি গল্পের আবহকে নতুন মাত্রা দেন। অতিথি চরিত্রে তমা মির্জা ও ব্যাংক কর্মকর্তার ভূমিকায় সৈয়দ আহমেদ শাওকী স্বল্প উপস্থিতিতে নিজেদের ছাপ রেখেছেন।
পরিচালক সালেহ সোবহান অনীম নির্মাণে অপ্রয়োজনীয় চমক কিংবা অতিরঞ্জিত অ্যাকশনের পথে হাঁটেননি; বরং তদন্তমূলক সাংবাদিকতার বাস্তবতা, তথ্য যাচাইয়ের জটিলতা এবং ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ঝুঁকিকে তিনি বিশ্বাসযোগ্যভাবে উপস্থাপন করেছেন। ক্যামেরার ব্যবহার, সম্পাদনা এবং আবহসংগীত গল্পের উত্তেজনা ধরে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। যদিও কিছু জায়গায় ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের আধিক্য ও শেষের পর্বে বর্ণনার গতি কিছুটা শ্লথ হয়ে যায়, তবুও সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে তা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না।
শেষ দৃশ্যের সংলাপ, ‘বিগ ব্রাদার ইজ স্টিল ওয়াচিং’ যেন ইঙ্গিত দেয় গল্পটি শেষ হয়নি; বরং প্রকৃত লড়াই এখনো চলমান। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে নতুন কোনো যাত্রার ইঙ্গিত।





