সত্যিই কি শাকিব মেগাস্টার

শাকিব খান। গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘প্রিয়তমা’ ব্লকবাস্টার হওয়ার পর ‘রাজকুমার’-এর পোস্টারে শাকিবের নামের আগে ‘মেগাস্টার’-এর পালক লাগে। তবে এই খেতাবের ব্যবহার প্রবল হয় ‘তুফান’ সুপারহিট হওয়ার পর। ‘তুফান’-এর প্রথম দুটি ফার্স্ট লুক পোস্টারেই শাকিবের নামের আগে ‘সুপারস্টার’ বসানো হয়। শাকিব তার খেতাবের সার্থকতা প্রমাণ করেন বক্স অফিসে ‘তুফান’ হিট করিয়ে। সমাজের উঁচুতলার দর্শকের কাছে শাকিবের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যায়। সংবাদমাধ্যমে হইহই পড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত ট্রেন্ড হয়ে দেশের সবচেয়ে বড় তারকা হিসেবে তার একধরনের স্বীকৃতি জুটে যায়। সোনাল চৌহানের মতো ভারতীয় নায়িকাদের সঙ্গে কাজ করে আরও বেশি মাইলেজ পেয়ে যান শাকিব। ‘দরদ’-এর প্রচারণায় সিনেমাটিকে ‘প্যান ইন্ডিয়া মুভি’ বলেও উল্লেখ করা হয়। যার অর্থ, শাকিব একজন সর্বভারতীয় তারকা! ভক্তরা তথা শাকিবিয়ানরা তাকে ‘গ্লোবাল স্টার’ বলতেও ছাড়েননি ওই সময়।
কিন্তু এখন? শাকিবকে যত বড় তারকা বলে দাবি করা হয়, আসলেই কি তিনি অতটা প্রতিপত্তি রাখেন? আসলেই কি তিনি এখন ‘মেগাস্টার’?
২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে চিত্রনায়ক মান্নার মৃত্যু হয়। খালি মাঠ পেয়ে যান শাকিব। শুরু হয় তার জয়যাত্রা। মান্না বেঁচে থাকতেই বেশ কটি সুপারহিট সিনেমা দিয়ে এক নম্বর নায়কের আসনও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু মান্না জীবিত থাকতে শাকিব ছিলেন চ্যালেঞ্জের মুখে। মান্না চলে যাওয়ার পর পুরো ইন্ডাস্ট্রি শাকিবের কাঁধে সওয়ার হয়। তার সিনেমা আগের মতোই হিট-সুপারহিট হতে থাকে। এর মধ্যে ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’ ব্লকবাস্টার হয়। শোনা যায়, প্রায় ১৫ কোটি টাকা আয় করেছিল। শাকিবের পারিশ্রমিক একলাফে ৩৫ লাখ টাকা হয়। তখন থেকেই শাকিবকে ‘কিং খান’ বলে ডাকা শুরু হয়।
ঈদে শাকিবের নতুন মুভি মুক্তি পেয়েছে প্রায় ৩০০ সিনেমা হলে আর পুরনো চলছে আরও ৩০০টিতে। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে কোনো নায়ক এরকম একচেটিয়াভাবে ইন্ডাস্ট্রি শাসন করতে পেরেছেন কি না আমাদের জানা নেই
২০০৮ সালে শাকিব অভিনীত ‘এক টাকার বউ’, ‘মনে প্রাণে আছ তুমি’, ‘আমার জান আমার প্রাণ’, ‘সন্তান আমার অহংকার’ সুপারহিট। ওই বছর তার অভিনীত ১৪টি মুভি মুক্তি পায়। ২০০৯ সালে তার অভিনীত সিনেমার সংখ্যা ১৭। এর মধ্যে ‘বলব কথা বাসর ঘরে’, ‘জান আমার জান’, ‘সাহেব নামে গোলাম’, ‘মায়ের হাতে বেহেশতের চাবি’ সুপারহিট। শেষেরটি প্রায় রিলিজ হয় ১০০ সিনেমা হলে।
২০০৯ সালের ঈদুল ফিতরে শাকিবের সিনেমা আসে পাঁচটি। ২০০৮ সালের ঈদুল ফিতরেও পাঁচটি। ২০০৭ সালের ঈদুল ফিতরে মুক্তি পায় চারটি। ২০০৭ থেকে ২০১৯ সাল— প্রতি ঈদে কমপক্ষে তিনটি সিনেমা মুক্তি পেত তার। কভিডের আগপর্যন্ত এই রেকর্ড অক্ষুণ্ন ছিল।
২০০৮-০৯ সালের দিকে সিনেমা হলের সংখ্যা কমে হয় ৮০০। তখন দেখা যেত, ঈদে শাকিবের নতুন চারটি মুভি মুক্তি পেয়েছে প্রায় ৩০০ সিনেমা হলে আর পুরনো চলছে আরও ৩০০টিতে। বিশ্ব সিনেমার ইতিহাসে কোনো নায়ক এরকম একচেটিয়াভাবে ইন্ডাস্ট্রি শাসন করতে পেরেছেন কি না, আমাদের জানা নেই। তাকে কেন্দ্র করেই ইন্ডাস্ট্রিতে পুঁজির প্রবাহ ছিল তখন।
বিগত দশকে প্রতি বছর সিনেমা মুক্তি পেত ৫০-৬০টি করে। রিয়াজ, আমিন খান, কাজী মারুফ, ইমন, নিরবসহ আরও কয়েকজন নায়ক নিয়মিত সিনেমা করতেন। পরের দিকে আরিফিন শুভ, বাপ্পি চৌধুরী, সাইমন সাদিক, অনন্ত জলিলসহ একাধিক নায়ক পর্দায় আসেন। প্রতিযোগিতা হলেও কেউই শাকিবের একক রাজত্বে চিড় ধরাতে পারেননি।
প্রতি বছরের সবচেয়ে ব্যবসাসফল সিনেমাটি থাকত শাকিবের। ২০০৬ সালে ‘চাচ্চু’, ২০০৭ সালে ‘আমার প্রাণের স্বামী’, ২০০৮ সালে ‘প্রিয়া আমার প্রিয়া’, ২০১০ সালে ‘নাম্বার ওয়ান শাকিব খান’, ২০১১ সালে ‘তোর কারণে বেঁচে আছি’, ২০১২ সালে ‘খোদার পরে মা’, ২০১৩ সালে ‘মাই নেম ইজ খান’, ২০১৪ সালে ‘হিরো— দ্য সুপারস্টার’, ২০১৬ সালে ‘শিকারী’, ২০১৭ সালে ‘নবাব’— প্রতি বছর শীর্ষ ব্যবসাসফল মুভিটি হতো শাকিব অভিনীত। এভাবে শীর্ষ নায়কের অবস্থান তিনি ধরে রাখতেন।
একজন তারকার জন্য সর্বোচ্চ উপাধি হলো ‘সুপারস্টার’। তবে বক্স অফিসে ধারাবাহিক সাফল্য পেলে ভক্তরাই তাকে ‘মেগাস্টার’ তকমা দেয়
এই একনায়ক-নির্ভরতাই ইন্ডাস্ট্রির জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। একজন নায়কের পক্ষে যুগের পর যুগ ইন্ডাস্ট্রিকে ধরে রাখা সম্ভব নয়। ফলে একসময় চলচ্চিত্র ব্যবসায় ভাটার টান দেখা দেয়। ধীরে ধীরে সিনেমা হল বন্ধ হতে থাকে। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানে ঝুলতে থাকে তালা। সেলুলয়েড যুগ শেষে ডিজিটাল যুগ এলে আজেবাজে সিনেমার জোয়ার ওঠে। মেধাহীন নির্মাতাদের আস্ফালনে ঢালিউডে দেখা দেয় খরা। কভিড এসে অবস্থা আরও খারাপ করে দেয়।
প্রত্যাবর্তনের সূচনা হয় ২০২৩ সালে ‘প্রিয়তমা’ দিয়ে, যে কথা শুরুতেই বলেছি। তখন ‘কিং খান’ খেতাব আর যথেষ্ট নয় শাকিবের জন্য। নতুন খেতাব ‘মেগাস্টার’-এ ভূষিত করা হয় তাকে। কিন্তু বাস্তবে শাকিবকে এই খেতাবের উপযুক্ত অবস্থায় দেখতে পাই এক যুগ আগে যখন প্রায় প্রতিটি উপজেলায় প্রেক্ষাগৃহ ছিল। যখন মফস্বলে তার সিনেমা নিয়ে প্রদর্শকদের মধ্যে কাড়াকাড়ি হতো। এখন দেশের প্রায় অর্ধেক জেলায় সারা বছর মুভি চলে এমন সিনেমা হল ৫০টি হবে কি না সন্দেহ। শুধু দুই ঈদে শখানেক প্রেক্ষাগৃহ খোলে, দুই-তিন সপ্তাহ সিনেমা চলে ফের বন্ধ হয়ে যায়।
তবে শাকিবের নতুন বাজার হয়েছে মাল্টিপ্লেক্স। ‘শিকারী’ দিয়ে এই বাজার খুললেও বড় ধাক্কাটা দেয় ‘প্রিয়তমা’। বাংলা সিনেমার নতুন দিগন্ত খুলে যায়; খুলে যায় বিপুল ব্যবসার দুয়ার। দেশের বাইরেও এখন শাকিবের সিনেমা ভালো চলে। বৈদেশিক মুদ্রার এই খাত একসময় পুরো অচেনা ছিল শাকিবের জন্য। তবু তার পায়ের কোথায় কাঁটা ফুটছে, সেটি বলি।
গত কয়েক বছরে অভিনেতা হিসেবে শাকিব নিজের উত্তরণ ঘটিয়েছেন সত্যি, ড্রেস-লুক-গ্ল্যামারে চমক জাগিয়েছেন ঠিকই, আবার একটানা পর্দায় নৃশংসতা ছড়ানোর জন্য সমালোচিতও হয়েছেন। একটার পর একটা নেতিবাচক চরিত্র রূপায়ণ করেছেন। এতে তার ‘নায়ক’ ইমেজের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছে। পারিবারিক টানাহেঁচড়ায় ব্যক্তি ইমেজের ক্ষতিও কম হয়নি। কে জানে, হয়তো এগুলোই প্রভাব ফেলেছে তার জনপ্রিয়তায়।
শাকিব এখন বছরে দুটোর বেশি সিনেমা করেন না। এর বাজেট অনেক বেশি। পারিশ্রমিকও পান আকাশচুম্বী। কিন্তু ‘প্রিয়তমা’র পর গত তিন বছরে তার তিনটি বিশাল বাজেটের সিনেমা— ‘রাজকুমার’, ‘দরদ’ ও ‘প্রিন্স’ বক্স অফিসে চরম ভরাডুবির শিকার হয়েছে। ‘তাণ্ডব’ও আহামরি ব্যবসা করতে পারেনি। ‘রকস্টার’ও পারছে না এবং এই বছরের সর্বাধিক আয় করা মুভির দাবিদারও সম্ভবত ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।
শাকিব এখন আটকে গেছেন দুই ঈদে। আসলে গোটা ইন্ডাস্ট্রিই দুই ঈদের চক্করে ফেঁসে আছে। তাহলে শাকিবের এই ‘মেগাস্টার’ খেতাবের মানে কী? বরং বিগত দশকেই কি তিনি প্রকৃত ‘মেগাস্টার’ ছিলেন না, যখন তিনি কাটপিস-বিধ্বস্ত ঢালিউডকে কয়েক বছর একা হাতে ধরে রেখেছিলেন?




