ইব্রাহিমি মসজিদে আরও নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে ইসরায়েল

হারাম আল-ইব্রাহিমি মসজিদ, বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র স্থান। ছবি: সংগৃহীত
একের পর এক লোহার ফটকে অবরুদ্ধ পশ্চিম তীরের হেবরন, বন্ধ একাধিক রাস্তা। ইব্রাহিমি মসজিদকে ঘিরে ইসরায়েলের একের পর এক পদক্ষেপে বাড়ছে বিতর্ক। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ধাপে ধাপে মসজিদটির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এগোচ্ছে ইসরায়েল।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরনে নতুন করে বাড়ছে উত্তেজনা। শহরের রাস্তাঘাট বন্ধ করে, একের পর এক লোহার ফটক বসিয়ে এবং ইব্রাহিমি মসজিদকে ঘিরে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে ধাপে ধাপে নতুন বাস্তবতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে ইসরায়েল - এমনই অভিযোগ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের। হেবরনের গভর্নর খালেদ দোদিনের দাবি, এই পদক্ষেপ শুধু চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর লক্ষ্য শহরের উপর সামরিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং ইব্রাহিমি মসজিদের উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
ইসরায়েলি দখলদার কর্তৃপক্ষ অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন (আল-খলিল) জুড়ে বিধিনিষেধ আরও কড়া করেছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কয়েক ডজন লোহার ফটক বসিয়ে গোটা গভর্নরেটকে কার্যত অবরুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইব্রাহিমি মসজিদের উপর পূর্ণ ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নতুন পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।
গত মঙ্গলবার এক সাংবাদিক বৈঠকে খালেদ দোদিন জানান, ১০৬টি লোহার ফটক বসিয়ে গোটা গভর্নরেটকে ঘিরে ফেলা হয়েছে এবং মাটির ঢিবি ফেলে ১৬টি রাস্তা ও প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, নতুন প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত পদক্ষেপের মাধ্যমে ইব্রাহিমি মসজিদের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। গভর্নরের দাবি, গত ১০ দিন ধরে মসজিদে মুসলিমদের নামাজের আজান দিতে বাধা দিচ্ছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ। হেবরন প্রশাসনের বক্তব্য, সম্প্রতি গভর্নরেট জুড়ে ২০টিরও বেশি নতুন বসতি চৌকি গড়ে তোলা হয়েছে। দোদিনের মতে, এই পদক্ষেপ বৃহত্তর এক নীতির অংশ, যার মাধ্যমে চলাচলে বাধা, বসতি সম্প্রসারণ এবং সামরিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির মাধ্যমে হেবরন ও তার বাসিন্দাদের উপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
নিয়ন্ত্রণ দখলের পরিকল্পনা?
ইব্রাহিমি মসজিদের ছাদে চলতে থাকা নির্মাণকাজের তীব্র নিন্দা করে দোদিন বলেন, ফিলিস্তিনি আপত্তি সত্ত্বেও পরপর দ্বিতীয় দিন সেই কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এই প্রকল্প এমন এক পরিকল্পনার অংশ, যার উদ্দেশ্য একটি নতুন বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত মসজিদটির উপর ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। দোদিনের দাবি, মসজিদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং পানি সরবরাহের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিষেবার উপরও নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে এমন এক সিদ্ধান্তের পর, যেখানে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইব্রাহিমি মসজিদ সংক্রান্ত কাজের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব হেবরন পৌরসভার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে কিরিয়াত আরবা বসতি পরিষদের হাতে তুলে দেয়।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে এই সিদ্ধান্ত । তাদের বক্তব্য, এটি মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনি মর্যাদার পরিপন্থি।
বাড়ছে বিধিনিষেধ
হেবরনের পুরনো শহরে অবস্থিত ইব্রাহিমি মসজিদ অধিকৃত ফিলিস্তিনির অন্যতম স্পর্শকাতর ধর্মীয় স্থাপনা। শহরের এই অংশ এখনও ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রয়েছে। এলাকাটিতে প্রায় ৪০০ জন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীর বাস । তাদের নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন রয়েছে প্রায় ১,৫০০ জন ইসরায়েলি সেনা।
১৯৯৪ সালের হত্যাকাণ্ডের পর মসজিদটিকে ভাগ করে দেওয়া হয়। ওই বছর এক ইসরায়েলি ইহুদি বসতি স্থাপনকারী মসজিদের ভিতরে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লিকে হত্যা করে। পরে মসজিদের প্রায় ৬৩ শতাংশ অংশ ইহুদি উপাসনার জন্য এবং ৩৭ শতাংশ অংশ মুসলিম উপাসনার জন্য নির্ধারণ করা হয়। আগে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার মতো ধর্মীয় উৎসবের সময়ে মুসলিমদের পূর্ণ প্রবেশাধিকার দেওয়া হলেও, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই প্রবেশাধিকার ক্রমশ সীমিত করা হয়েছে।
বসতি সম্প্রসারণ
দোদিনের দাবি, ইব্রাহিমি মসজিদকে কেন্দ্র করে নেওয়া পদক্ষেপগুলি আসলে হেবরন জুড়ে ইসরায়েলের বৃহত্তর নীতির অংশ। তাঁর অভিযোগ, এই নীতির মধ্যে রয়েছে হত্যা, গ্রেফতার, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, বাড়িঘর ধ্বংস, জমি দখল এবং বসতি সম্প্রসারণ।
আজান ও ইবাদতে নিষেধাজ্ঞা
মসজিদ প্রাঙ্গণে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী । প্রায়শই ইহুদি উৎসবের অজুহাতে বা নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে এখানে ফিলিস্তিনিদের আজান দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয় মুসলিমদের প্রবেশাধিকার।
স্থানীয় প্রশাসনের নথি অনুযায়ী, হেবরন গভর্নরেট জুড়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ৭৬৩টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই ঘটনাবলি এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন অধিকৃত পশ্চিম তীর জুড়ে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনের সরকারি পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত ১,১৭৩ জন প্যালেস্টাইনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২,৬৬৬ জন। গ্রেফতার করা হয়েছে প্রায় ২৩,০০০ জনকে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৩৩,০০০ জন।
অনুবাদ : রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি





