ফ্রান্স ফুটবল যেন ফরাসি সুগন্ধি

ছবি: রয়টার্স
উসমান দেম্বেলের পাস থেকে কিলিয়ান এমবাপ্পের জোরালো শট। বিরতির ঠিক আগে সুইডেনের বিপক্ষে এগিয়ে যায় ফ্রান্স। এরপর শুধু এমবাপ্পে নয়, ফ্রান্সের প্রায় সবাই ছুটে যান সাইডলাইনের দিকে। মায়ের শেষকৃত্য শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসা কোচ দিদিয়ের দেশমকে জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন তারা। দলগত এই আলিঙ্গনে মানসিক ধকল আর নিউ জার্সির তীব্র গরমের মধ্যে দেশমের মুখে ফুটে ওঠে চওড়া হাসি।
এই যে একতা, একজনের অন্যের প্রতি নিবেদন, নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের দিকে ছোটা— এই দর্শনটাই অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে ফ্রান্সকে। একটা দল হয়ে খেলে ৬১ শতাংশ বলের দখল রেখে পোস্টে ২৫টি শট নিয়ে তারা ৩-০ গোলে বিধ্বস্ত করেছে সুইডেনকে। জোড়া গোল করে রেকর্ডের পাতাগুলো এলোমেলো করেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। অন্য গোলটি ব্র্যাডলি বারকোলার।
ম্যাচ শেষে আবেগী দেশম পুরো কৃতিত্বটা দিলেন দলকে, ‘এই দলটি একতাবদ্ধ। গত সপ্তাহে আমি যখন এখানে ছিলাম না, তখনো তারা দারুণ পারফর্ম করেছে। দলের এই একতাবদ্ধ মনোভাব আপনাকে ম্যাচ জেতাবে না। তবে আমি জানি, এর উল্টোটা হলে আপনি ম্যাচ হারতে পারেন। দলগত শক্তিই সবার ওপরে।’
আগের ম্যাচে হ্যাটট্রিক করা উসমান দেম্বেলে অ্যাসিস্ট করেছেন একটি আর জোড়া অ্যাসিস্ট করেছেন মাইকেল ওলিসে। এক বিশ্বকাপে ডিয়েগো ম্যারাডোনার সমান পাঁচ অ্যাসিস্ট এখন তার। ওলিসের চোখধাঁধানো একটি বাইসাইকেল কিক ফিরে এসেছিল পোস্টে লেগে। এমবাপ্পের একটি শটও ফিরেছিল পোস্টে লেগে।
ফ্রান্সের খেলা দেখে মুগ্ধ খোদ সুইডেনের কোচ গ্রাহাম পটারও, ‘এই ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়াটা কোনো লজ্জা নয়। এর চেয়ে ভালো দল আমি আর দেখিনি।’
ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী তারকা প্যাট্রিক ভিয়েরা যোগ করেন, ‘ফ্রান্স সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছে যে ওরাই হচ্ছে টুর্নামেন্টের আসল পরাশক্তি।’
এমবাপ্পে আরও একবার দেখালেন কেন তিনি এই গ্রহের সেরা ফিনিশার। এবারের বিশ্বকাপে মেসির সমান ছয় গোল এখন এমবাপ্পের। আর বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমবাপ্পের গোল ১৮টি, যা মেসির চেয়ে একটি কম। তবে বিশ্বকাপের নকআউট ম্যাচে সবচেয়ে বেশি ১০ গোলের রেকর্ড এমবাপ্পেরই। তিনি ফেলেছেন লিওনাদাস ও রোনালদো নাজারিওর আট গোলের রেকর্ড।
এমবাপ্পে-দেম্বেলে জুটির যৌথ অবদানে বিশ্বকাপে গোল হয়েছে ছয়টি, যা যেকোনো জুটির মধ্যে সর্বোচ্চ। তারা পেছনে ফেলেছেন জার্মানির মাইকেল বালাক-মিরোস্লাভ ক্লোসা আর পোল্যান্ডের গ্রেগরজ লাতো-আন্দ্রেজ শারমাখ জুটির পাঁচ গোলের কীর্তি।
ইংল্যান্ডের সাবেক স্ট্রাইকার ইয়ান রাইট মুগ্ধ এমবাপ্পের পারফরম্যান্সে, ‘এ ধরনের দক্ষতাকে আটকে রাখা অসম্ভব।’ ফ্রান্স প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের টানা পাঁচ ম্যাচে তিন বা তার বেশি গোল করার রেকর্ড গড়েছে। তাদের এমন দাপটে সবাইকে ভাবাতে বাধ্য করেছে, এই ফ্রান্সকে থামাবে কে?
ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার গ্যারি নেভিল আইটিভি স্পোর্টসকে বলেছেন, ‘ফ্রান্সের কাছ থেকে আমরা যা দেখেছি, তা হলো নিখুঁত এবং বিধ্বংসী ফুটবল। ম্যাচের শুরুতে যে ফরোয়ার্ড লাইনটি খেলেছে, তারা টুর্নামেন্টের যেকোনো ডিফেন্ডারের জন্য দুঃস্বপ্ন তৈরি করবে। সত্যি বলতে, তাদের কীভাবে আটকানো সম্ভব, তা আমার জানা নেই। তারা বাকিদের চেয়ে এক স্তর ওপরে।’
এত প্রশংসায় খুশি হলেও পথ যে অনেক বাকি, ভালোই জানা দেশমের, ‘দয়া করে একটু থামুন, এত তাড়াহুড়ো করবেন না। সবকিছুই একদম নিখুঁত হয়ে যায় না। আমরা শেষ ১৬-তে পৌঁছেছি। আসুন এটা উপভোগ করি। আমাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তা জানি। আমাদের শান্ত থাকতে হবে।’
শান্ত থেকেই ঝড় তুলতে চায় ফ্রান্স। আর একেকটা ধাপ জয় করে এগিয়ে যেতে চায় সেই সোনালি ট্রফিটার দিকে।




