সবুজ স্বপ্ন বুনছেন শাকির

রাস্তার পাশে গাছ লাগাচ্ছেন সিকান্দার আহমদ শাকির
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বলাই’ গল্পটি তার খুব প্রিয়। গল্পের বলাইয়ের মতোই প্রকৃতির প্রতি গভীর টান শাহ সিকান্দার আহমদ শাকিরের। গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকে নীরবে একের পর এক চারা রোপণ করে চলেছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩৯ হাজার গাছ লাগিয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী এই তরুণ।
শাকির পেশায় সহকারী হিসাবরক্ষক। কর্মরত আছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, সিলেটে। চাকরির ব্যস্ততার মধ্যেও গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। নিজের আয়ের একটি অংশও নিয়মিত ব্যয় করেন এ কাজে। প্রতি মাসে প্রায় ১ হাজার ৪৫০ টাকা গাছের জন্য আলাদা করে রাখেন তিনি।
গাছ লাগানোর এই নেশার শুরু শৈশবের একটি ঘটনা থেকে। ছোটবেলায় যে মাঠে খেলতেন, সেখানে ছিল বড় একটি গাছ। একদিন গিয়ে দেখেন, গাছটি নেই। সেখানে তৈরি হয়েছে দালান। প্রিয় গাছটি হারিয়ে যাওয়ার সেই ঘটনা তাকে ভীষণ কষ্ট দিয়েছিল। এরপর থেকেই যেখানে খালি জায়গা পেয়েছেন, সেখানেই কাউকে না জানিয়ে গাছ লাগান। বাড়ির আঙিনায় জায়গা না থাকলে অনেকের বাড়িতে ফুলের গাছ দিয়ে সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেন।
শাকিরের কাছে বৃক্ষরোপণ শুধু চারা মাটিতে পুঁতে দেওয়া নয়। গাছ লাগানোর পর অন্তত এক মাস নিয়মিত নিজে সেগুলোর তদারকি করেন। প্রয়োজন হলে বাঁশ কিনে বেড়া দেন, খুঁটি লাগান। অনেক সময় বন্ধু মনোয়ার, মাহবুব ও মাশরাফিকে নিয়ে এসব কাজ করেন।
সিলেট নগরীর বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, মন্দির, কবরস্থান, সড়ক বিভাজক ও রাস্তার পাশে রয়েছে তার লাগানো গাছ। কোথাও গাছ মারা গেলে সেখানে আবার নতুন চারা লাগান তিনি।
শাকির মনে করেন, ‘বৃক্ষরোপণের চেয়েও বৃক্ষ রক্ষা করা এখন জরুরি।’ তার বিশ্বাস, অট্টালিকা এবং নগর উন্নয়ন হবে, তবে সেই উন্নয়নের সঙ্গে বৃক্ষও থাকতে হবে। কারণ মানুষকে সুস্থ রাখতে হলে পরিবেশকেও সুস্থ রাখতে হবে।
প্রতি বছর ১৩ নভেম্বর বিশেষভাবে গাছ লাগান শাকির। দিনটি তার প্রিয় মানুষ কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিন। ২০১৩ সালে প্রথমবার এই দিনে ১৩টি বৃক্ষ রোপণ করেছিলেন। এরপর থেকে প্রতি বছর দিনটি বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে স্মরণ করেন তিনি। তার কাছে প্রিয় মানুষকে স্মরণ করার এর চেয়ে সুন্দর উপায় আর কী হতে পারে!
নিজের পরিবারেও তার দায়িত্ব কম নয়। বাবা ঠিকাদারি করতেন, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী। মা গৃহিণী। সিলেটে নিজেদের কোনো জায়গাজমি নেই। সিলেট নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মদিনা মার্কেট এলাকার নেহারিপাড়ায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন শাকির। তার পৈতৃক বাড়ি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জে।
প্রায় ৩৯ হাজার গাছ লাগানোর পর এখন তার স্বপ্ন নিরাপদ বসবাসের জন্য সবুজ নগরায়ণ। এমন একটি শহর চান, যেখানে উন্নয়ন হবে, কিন্তু সেই উন্নয়নের পথে গাছ হারিয়ে যাবে না।
শাকিরের কাছে গাছ মানে শুধু সবুজ নয়— গাছ মানে ছায়া, অক্সিজেন, ফল, সৌন্দর্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন। তাই অফিসের ব্যস্ততা শেষে কিংবা ছুটির দিনে হাতে চারা, বাঁশ আর খুঁটি নিয়ে শহরের পথে বেরিয়ে পড়েন তিনি। নীরবে বেড়ে ওঠা সেই গাছগুলোই একদিন হয়তো সাক্ষ্য দেবে— সিলেটের সবুজে মিশে আছে শাকিরের ভালোবাসা।






