মানুষ কিংবা প্রাণী সবার পাশেই মামুন

হাজারো গল্প সিরাজগঞ্জের মামুনকে নিয়ে। ছবি: আগামীর সময়
বলছি মামুন বিশ্বাসের কথা। তার আগে বলে নিই মেহেরুনের কথা। তিনি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। তার জন্মের আগেই মাকে ছেড়ে যান বাবা। ছোটবেলায় বাড়ি থেকে বের করে দেন মা ও মামাবাড়ির সবাই মিলে। এ পথ-ও পথ ঘুরে একসময় তৃতীয় লিঙ্গের সাথীদের সঙ্গেই শুরু করেন পথচলা। কিন্তু সাথীরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে যে ব্যবহার করেন, সেটি ভালো লাগেনি তার। এরপর ফিরে যেতে চান সাধারণ জীবনে। এক টুকরো জায়গা কেনেন যমুনার চরাঞ্চলে। সেখানে মানুষের কটু কথার মধ্যেই ঘর তুলে বসবাস; মাটি কেটে, জমিতে কাজ করে জীবন-যাপন। একপর্যায়ে মেহেরুনের জীবনে যেন বিশেষ দূত হয়ে আসেন মামুন বিশ্বাস।
মেহেরুনের জীবনের বিস্তারিত তুলে ধরে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন মামুন। এর পরই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ। সেই টাকায় মামুন মেহেরুনকে করে দেন একটি রঙিন টিনের ঘর। কিনে দেন তিনটি ছাগল, খাট, দত্তক নেওয়া মেহেরুনের মেয়ের জন্য পড়ার টেবিল, চাল-ডালসহ প্রায় সবকিছু। চাষাবাদ করার জন্য ১ লাখ টাকা দিয়ে বর্গায় নিয়ে দেন জমি। মেয়ের পড়াশোনার জন্য প্রতি মাসে দেন ১ হাজার ৫০০ টাকা। ওই চরাঞ্চলের অসহায় মানুষের কোনো সহযোগিতা লাগলে সেটিও করান ওই মেহেরুনের মাধ্যমেই।
এমনই হাজারো গল্প সিরাজগঞ্জের মামুনকে নিয়ে। অসহায়-এতিম মেয়েদের বিয়ে, মাথার ওপর চাল না থাকা মানুষের ঘরের ব্যবস্থা, বৃদ্ধ ও পঙ্গুদের অটোভ্যান কিনে দেওয়া, অনাহারীর মুখে খাবার, রাস্তায় পড়ে থাকা অসুস্থ মানুষটির চিকিৎসার ব্যবস্থা, বন্যাসহ দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যান মামুন। হাত লাগান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণেও। এই সমাজকর্মীর রয়েছে ‘দ্য বার্ড সেফটি হাউজ’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানও। ২০১৩ সাল থেকে বন্যপ্রাণীর জন্য কাজ শুরু করেন। তখন প্রথমে গাছে গাছে মাটির কলস বেঁধে পাখির নিরাপদ আশ্রয়ে ব্যবস্থা করতেন।
কিন্তু টাকা জোগাড় করেন কীভাবে? মামুনের কথায়, “২০১৬ সালে জনপ্রিয় ইত্যাদি অনুষ্ঠানে হানিফ সংকেত ‘ফেসবুকের ভিন্ন ব্যবহারের’ ওপর আমাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার করেন। তারপর দেশ ও দেশের বাইরে টেলিভিশন ও পত্রিকায় আমাদের কাজগুলো প্রচার হয়। আমার যেকোনো ফেসবুক পোস্টে দেশ ও প্রবাসী ভাইবোনরা টাকা পাঠান। আমার প্রতিটি পোস্টে কাজের ও টাকার হিসাব দেওয়া হয়।” তিনি যোগ করেন, ‘আমার এই কাজের কৃতিত্ব ফেসবুক বন্ধুদের, আমি মাত্র চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইত্যাদি অনুষ্ঠান আমাকে মানুষের জন্য কাজ করতে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।’
আগামীর সময়কে মামুন বলেছিলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের যে কী কষ্ট, আমার প্রতিবন্ধী বোনকে দেখে বুঝতে পারি। এ ছাড়া জন্মের ৩৮ ঘণ্টার মাথায় মারা যায় আমার নবজাতক ছেলেও। সন্তানকে বাঁচাতে দৌড়ে বেড়াই চারটি হাসপাতালে। কিন্তু সব প্রচেষ্টাই বিফলে যায়। বুঝি টাকাই জীবনের সব নয়।’ মামুনের জন্ম আর বেড়ে ওঠা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার বেলতৈল ইউনিয়নের আগনুকালী গ্রামে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক। বড় ভাইয়ের সঙ্গে ব্যবসা দেখাশোনার পাশাপাশি ২০১৪ সাল থেকে নেমে যান ‘মানবতার সব’ কাজে।




