থেমে গেছে ধ্বংসস্তূপের আর্তনাদ, ক্ষীণ হচ্ছে আশার আলো
- অন্তত ১,৭০০ জনের মৃত্যু, ৫,০০০-এর বেশি আহত
- এখনো বহু মানুষের হদিস নেই
- উদ্ধারকাজে ধীরগতির অভিযোগে বাড়ছে ক্ষোভ
- পথে পথে পচা লাশের বিদঘুটে গন্ধ
- মৃত্যুর গন্ধ ভাসছে বহু ধসেপড়া ভবনের চারপাশে

ভূমিকম্পে ধংসস্তূপ ভেনেজুয়েলা। ছবি: সংগৃহীত
ধ্বংসস্তূপের পাশে আচমকা নেমে আসে নিস্তব্ধতা। উদ্ধারকর্মীরা হাত তুলে সবাইকে চুপ থাকার ইশারা করেন। মুহূর্তেই থেমে যায় খননযন্ত্রের শব্দ, থেমে যায় মানুষের কথাবার্তা। কংক্রিটের স্তূপে তৈরি ছোট্ট একটি গর্তে কান পেতে শোনার চেষ্টা চলে— এখনো কি কোথাও কোনো প্রাণের স্পন্দন বেঁচে আছে? ভেনেজুয়েলার উপকূলবর্তী লা গুয়াইরা থেকে রাজধানী কারাকাস— গত বুধবারের জোড়া শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের। সরকারি হিসাবে অন্তত ১,৭০০ জনের মৃত্যু হয়েছে, আহত ৫,০০০-এরও বেশি। কিন্তু ধসে পড়ে শত শত ভবন। ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের খবর বলছে, এখনো চাপা পড়ে রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। এখনো চলতে থাকা অনুসন্ধান ঘিরে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ, মৃত্যুর হিসাব আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে জাতিসংঘ।
গত মঙ্গলবার সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম কয়েক দিনে ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছিল আর্তনাদ। কোথাও কেউ পানি চাইছেন, কোথাও সাহায্যের জন্য ডাকছেন। এখন সে শব্দ ক্রমেই বিরল হয়ে এসেছে। সময় যত গড়াচ্ছে, ততই ক্ষীণ হচ্ছে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার আশা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে, উদ্ধারকাজের গতি নিয়ে। ক্ষতিগ্রস্ত বহু পরিবারের অভিযোগ, বিপর্যয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়েছে। অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারাই প্রথমে খালি হাতে, কোদাল, লোহার রড কিংবা ভাঙা যন্ত্রপাতি নিয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করেন। কোথাও কোথাও সরকারি উদ্ধারকারী দল পৌঁছতে একাধিক দিন লেগেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ধসেপড়া একটি আবাসনের সামনে দাঁড়িয়ে এক বাবা এখনো অপেক্ষা করছেন তার ছেলের জন্য। অন্য এক ব্যক্তি খুঁজছেন স্ত্রী ও কন্যাকে। হাসপাতালের তালিকায় নাম খুঁজে বেড়াচ্ছেন এক মা, যার দুই মেয়ের এখনো কোনো খোঁজ নেই। তাদের প্রত্যেকের কথায় একই সুর— হয়তো এখনো কেউ বেঁচে আছে, হয়তো আরেকটু দ্রুত সাহায্য পৌঁছলে ফল অন্য রকম হতে পারত। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে দুই কিশোরী মেয়ের খোঁজ করছিলেন এক মা, ডেইলিসবেথ হেরেইরা। ভূমিকম্পের সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন। তার ধারণা, মেয়েরা বাড়িতেই ছিল। কিন্তু এখনো তাদের কোনো খোঁজ নেই। হাসপাতালের তালিকা থেকে শুরু করে আশ্রয়কেন্দ্র— সব জায়গায় খুঁজে বেড়াচ্ছেন তিনি। তার অভিযোগ, অনেক পরিবারকে কার্যত নিজেদের উদ্যোগেই স্বজনদের খোঁজ চালাতে হচ্ছে। একই রকম ক্ষোভ শোনা যাচ্ছে অনেকের গলায়। স্থানীয় বাসিন্দা কেভিন মন্টিয়ার স্ত্রী ও ১৬ বছরের মেয়ে ভূমিকম্পের সময় বাড়িতে ছিলেন। তার অভিযোগ, উদ্ধার অভিযান শুরু হতে অনেক দেরি হয়েছে এবং প্রথম দিকে এলাকার মানুষজনই মূলত নিজেরা উদ্ধারকাজ চালিয়েছেন।
সংকট আরও গভীর হয়েছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায়। বহু হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, কোথাও শয্যার অভাব, কোথাও ওষুধ বা চিকিৎসাকর্মীর ঘাটতি। যেসব হাসপাতাল চালু আছে, সেগুলোও আহতদের চাপে কার্যত নুইয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের মতে, এত বড় বিপর্যয়ের জন্য দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রস্তুত ছিল না।
৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প দুটির ধ্বংসযজ্ঞের পরিমাণ এতটাই ব্যাপক যে, কারাকাসে প্রাথমিক হিসাবে ৪৩২টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্তত আটটি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যেও সোমবার ইকুয়েডরের উদ্ধারকারীরা লা গুয়াইরার ধ্বংসস্তূপ থেকে ১২ বছরের এক কিশোরকে জীবিত উদ্ধার করেন। অন্যদিকে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ আপাতত স্কুল, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা খোলা জায়গায় দিন কাটাচ্ছেন। এর মধ্যেই সোমবার সকালে আবার একটি ৪ দশমিক ৯ মাত্রার আফটারশক নতুন আতঙ্ক ছড়ায়। যাদের বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে, তারাও অনেক ক্ষেত্রে সেখানে ফিরতে পারছেন না। ভবনের গায়ে ফাটল, চারপাশে অনিশ্চয়তা। আবার ভূমিকম্পের ২৪ ঘণ্টা পর থেকেই ধ্বংসস্তূপ থেকে পচা-গলা মরদেহের গন্ধ ছড়াতে শুরু করে। বর্তমান চিত্রটা আরও ভয়াবহ। পথে পথে পচা লাশের বিদঘুটে গন্ধ! দুর্গন্ধ ভাসছে বহু ধসেপড়া ভবনের চারপাশেও। সেই গন্ধ এতটাই তীব্র যে, তা উপেক্ষা করা কঠিন, কিন্তু তবুও স্বজনেরা ধ্বংসস্তূপের পাশ ছেড়ে যাচ্ছেন না। কারণ তাদের বিশ্বাস, হয়তো এখনো কেউ জীবিত আছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের পর প্রথম
কয়েক দিনকে জীবিত উদ্ধার অভিযানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ধরা হয়। সে সময় পেরিয়ে
যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে আসে। তবু আশা পুরোপুরি
হারাতে চাইছেন না স্বজনেরা। ধ্বংসস্তূপের পাশে এখনো বসে আছেন বহু মানুষ। কেউ সন্তানের
জন্য, কেউ স্বামী বা স্ত্রীর জন্য, কেউ মা-বাবার জন্য। উদ্ধারকর্মীরা যখন আবার কয়েক
মুহূর্তের জন্য নীরবতা চান, তখন সবাই নিঃশ্বাস আটকে শোনার চেষ্টা করেন— কংক্রিটের নিচে
এখনো কি কোথাও জীবনের কোনো ক্ষীণ সাড়া বাকি আছে?
ভাষান্তর : রুবাইয়া জেসমিন, কলকাতা প্রতিনিধি।




