ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের লাভ-ঝুঁকি

মডেল: স্বাগতা। ছবি: সাজ্জাদ হোসেন
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং। এর ভালোমন্দ বিভিন্ন বিষয়ে জানাচ্ছেন চট্টগ্রাম ডায়াবেটিক জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র পুষ্টিবিদ মো. ইকবাল হোসেন
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কী
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং হলো এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যেখানে নির্দিষ্ট সময় কোনো ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ করা হয় না এবং বাকি সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়া হয়। উপবাসের সময় পানি, চিনি ছাড়া গ্রিন টি, ব্ল্যাক কফি কিংবা সাধারণ লেবুপানি পান করা যেতে পারে।
এ অভ্যাস কখন খাবেন, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়। পাশাপাশি কী খাবেন, সেটিও জরুরি। শুধু দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলেই হবে না; খাওয়ার সময়টুকুতে সুষম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হবে।
কেন এত জনপ্রিয়
গত এক দশকে ওজন নিয়ন্ত্রণ, সুস্থ জীবনযাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপাকজনিত রোগের ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং গোটা দুনিয়াতেই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বাস্থ্যবিষয়ক ব্লগ, ফিটনেস বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন গবেষণার আলোচনায় এটি বারবার উঠে এসেছে। অনেকের ধারণা, দিনভর খাওয়ার বদলে শরীরকে নির্দিষ্ট সময় বিশ্রাম দিলে বিপাকক্রিয়া আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি কোনো জাদুকরি পদ্ধতি নয়। কেবল উপবাস করলেই ওজন কমবে বা সব স্বাস্থ্যসমস্যার সমাধান হবে-এমন ভাবার সুযোগ নেই। বরং সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের সঙ্গে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং যুক্ত হলে তবেই এর প্রকৃত সুফল পাওয়া সম্ভব। তাই অন্যের অভিজ্ঞতা দেখে নয়, নিজের বয়স, শারীরিক অবস্থা ও জীবনযাত্রা বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শে এ অভ্যাস শুরু করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
কীভাবে শুরু করবেন
যারা নতুন ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং শুরু করতে চান, তারা প্রথমে ১২ ঘণ্টা উপবাস দিয়ে শুরু করতে পারেন। শরীর অভ্যস্ত হয়ে গেলে ধীরে ধীরে ১৪ ঘণ্টা এবং পরে ১৬ ঘণ্টা উপবাসের দিকে যেতে পারেন।
সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো ১৬:৮। অর্থাৎ, টানা ১৬ ঘণ্টা কোনো ক্যালোরিযুক্ত খাবার গ্রহণ না করে বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে দিনের প্রয়োজনীয় খাবার খাওয়া। যেমন, সন্ধ্যা ৬টায় রাতের খাবার শেষ করলে পরদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত উপবাস এবং সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দিনের সব খাবার গ্রহণ।
তবে এসব পদ্ধতি দীর্ঘদিন অনুসরণ সবার জন্য নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘ সময়ের উপবাস এড়িয়ে চলাই ভালো।
ফাস্টিং ভাঙবেন যেভাবে
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করে উপবাস ভাঙার ধরন এবং খাবারের মানের ওপর। দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেললে শরীরে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণে ওজন কমানোর লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রথমে এক বা দুই গ্লাস পানি পান করে শরীরকে প্রস্তুত করুন। এরপর ফল, দই, এক মুঠো বাদাম, সেদ্ধ ডিম কিংবা অন্য কোনো হালকা ও পুষ্টিকর খাবার দিয়ে ফাস্টিং ভাঙা ভালো। মূল খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আঁশসমৃদ্ধ শাকসবজি, পরিমিত জটিল শর্করা এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি রাখুন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া বা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। মনে রাখবেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং মানে কম খাওয়া নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শরীরের প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য।
দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর একসঙ্গে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেললে শরীরে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে এবং অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণে ওজন কমানোর লক্ষ্যও ব্যাহত হতে পারে
উপকারিতা
● গবেষণায় দেখা গেছে, সঠিকভাবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণ করলে শরীরের অতিরিক্ত চর্বি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
● ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত করে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
● কোষের স্বাভাবিক মেরামত প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে সাহায্য করতে পারে।
● শরীরে প্রদাহ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।
● রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে।
● শরীরের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম বাড়াতে সাহায্য করে।
● রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।
● অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক একাগ্রতা ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।
● নিয়মিত ব্যায়াম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে মিলিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।
ঝুঁকিও আছে
পরিকল্পনা ছাড়া বা অতিরিক্ত সময় ধরে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কিছু সমস্যা ডেকে আনতে পারে।
● এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে।
● দুর্বলতা, মাথা ঘোরা কিংবা অতিরিক্ত ক্লান্তি দেখা দিতে পারে।
● ডায়াবেটিস বা প্রি-ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার ওঠানামা হতে পারে।
● দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে পরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে, ফলে ওজন আবার বাড়তে পারে।
● পর্যাপ্ত প্রোটিন ও পুষ্টি না পেলে চুল পড়া বা ত্বকের সমস্যা বাড়তে পারে।
● কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুমের সমস্যা, বিরক্তিভাব হওয়ার পাশাপাশি মনোযোগ কমে যেতে পারে।
কারা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করবেন না
নিচের ব্যক্তিদের চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ ছাড়া ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করা উচিত নয়-
● গর্ভবতী নারী
● স্তন্যদানকারী মা
● শিশু ও কিশোর-কিশোরী
● ইনসুলিননির্ভর ডায়াবেটিস রোগী
● দীর্ঘদিনের কিডনি বা লিভারের রোগী
● অতিরিক্ত কম ওজনের ব্যক্তি
● যাদের খাওয়া-দাওয়াজনিত মানসিক সমস্যা রয়েছে
শুধু উপবাস নয়, খাবারেও নজর দিন
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খাবারের মান। খাওয়ার সময় পর্যাপ্ত প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি, জটিল শর্করা, শাকসবজি, ফল এবং ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার রাখতে হবে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার, কোমল পানীয়, মিষ্টি বা ফাস্টফুড খেলে ফাস্টিংয়ের সুফল অনেকটাই কমে যেতে পারে।




