ওটিটির সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে: রিচি

রিচি সোলায়মান
টেলিভিশন নাটকে একসময় বেশ ব্যস্ত অভিনেত্রী ছিলেন রিচি সোলায়মান। ক্যারিয়ারের মধ্যগগনে অভিনয় থেকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যান তিনি। সংসার-সন্তান নিয়ে দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন এই তারকা। ইদানীং দেশেই বেশি সময় থাকছেন। ফলে পর্দায় তার উপস্থিতি দেখা যায় মাঝেমধ্যে।
রিচি জানিয়েছেন, অভিনয় থেকে তিনি অবসর নেননি। বরং এখনো ভালো গল্প, শক্তিশালী চরিত্র এবং মানসম্মত কাজের অপেক্ষায় আছেন। তার কথায়, ‘বর্তমানে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে অনেক ভালো কাজ হচ্ছে; কিন্তু সেখানে কাজ করার সুযোগ সবার জন্য সমান নয়। যদি এই সীমাবদ্ধতা দূর হয় এবং উপযুক্ত চরিত্র আসে, তাহলে অবশ্যই অভিনয়ে ফিরতে চাই। সিন্ডিকেট থেকে বেরিয়ে আমাকে ডাকলে এবং আমার জন্য জুতসই চরিত্র থাকলে অবশ্যই কাজ করব।’
নাটকে ‘সিন্ডিকেট’
নাটক ও ওটিটি অঙ্গনের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন রিচি সোলায়মান। তার মতে, এখন আর আগের মতো মানসম্পন্ন নাটক হয় না। বিশেষ করে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একচেটিয়া প্রভাব তৈরি হয়েছে, যেখানে একই মানুষ বারবার কাজের সুযোগ পাচ্ছেন। অন্যদিকে নতুন কিংবা অভিজ্ঞ দুই পক্ষের অনেকেই কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না।
রিচির মতে, এই সিন্ডিকেট সংস্কৃতিই দেশের নাট্যাঙ্গনে বড় ক্ষতির কারণ। তিনি বললেন, ‘এই সিন্ডিকেটের কারণেই আজ মিডিয়ায় ধস নেমেছে। আমরা সামনে এগোইনি; বরং পিছিয়ে গেছি।’
রিচি মনে করেন, এ অবস্থার পরিবর্তন হওয়া জরুরি। কাউকে না কাউকে এই চক্র ভাঙার উদ্যোগ নিতেই হবে। তার মতে, পুরো ইন্ডাস্ট্রির সবাইকে দায়িত্ব নিতে হবে।
রিচি আরও বললেন, ‘নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতির চেয়ে আমার বেশি খারাপ লাগে তাদের জন্য, যাদের একমাত্র পেশাই অভিনয়। সিন্ডিকেটের কারণে কাজ না পেয়ে তাদের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’
বিরতি মানেই কি ভুলে যাওয়া
রিচি সোলায়মান মনে করেন— দেশের বিনোদন অঙ্গনে এমন একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যেখানে কোনো শিল্পী কিছুদিন বিরতি নিলেই তাকে কার্যত ভুলে যাওয়া হয়। পৃথিবীর অন্য কোথাও এমন চিত্র দেখা যায় না। তিনি বললেন, ‘একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত জীবন থাকতে পারে। সংসার, সন্তান কিংবা অন্য কোনো কারণে কেউ কিছুদিন কাজ থেকে দূরে থাকতেই পারেন; কিন্তু তার মানে এই নয়, তিনি অভিনয় করতে ভুলে গেছেন বা তাকে আর প্রয়োজন নেই।’
রিচির মতে, অভিজ্ঞ শিল্পীদের দূরে সরিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং নতুন নির্মাতাদের মধ্যে সিনিয়র শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ থাকা উচিত। এতে যেমন নির্মাতাদের অভিজ্ঞতা বাড়বে, তেমনই ভালো কাজ উপহার পাবেন দর্শক। তিনি বললেন, ‘একজন আত্মবিশ্বাসী পরিচালকের কখনোই ভাবা উচিত হবে না, একজন প্রতিষ্ঠিত শিল্পীকে পরিচালনা করা কঠিন হবে। বরং এটি তাকে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা এনে দিতে পারে। তার আক্ষেপ, ‘বর্তমানে সেই মানসিকতা খুব একটা দেখা যায় না।’
বিচারকের আসনে
‘ফেস অব টুমরো’ শীর্ষক একটি রিয়েলিটি শোতে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রিচি সোলায়মান। নতুন অভিনয়শিল্পী বাছাইয়ের এই প্রতিযোগিতার অন্য দুই বিচারক নির্মাতা অনিমেষ আইচ ও অভিনেত্রী নাজনীন হাসান চুমকী।
অভিনয়শিল্পী খোঁজার আয়োজনে এবারই প্রথম বিচারক হিসেবে কাজ করছেন রিচি। তার ভাষায়, ‘এ অভিজ্ঞতা একেবারেই আলাদা। কারণ অভিনয়ের পাশাপাশি প্রতিযোগীদের সম্ভাবনা, শেখার আগ্রহ, ক্যামেরার সামনে উপস্থিতি এবং ভবিষ্যতে শিল্পী হিসেবে গড়ে ওঠার সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হয়। নিজের কাজের ক্ষেত্র হওয়ায় এই দায়িত্ব পালন করতে ভালো লেগেছে।’
প্রতিযোগীদের পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট বুঝেছেন রিচি। সেটি হলো, মেয়েরা তুলনামূলক অনেক বেশি নিবেদিত, আন্তরিক ও পরিশ্রমী। শুধু অভিনয় নয়, যেকোনো বিষয়ে ধারাবাহিক অনুশীলন ও আত্মনিবেদন খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। তার দৃষ্টিতে, ‘বেশিরভাগ ছেলের মধ্যে সেসবের অভাব রয়েছে। এ কারণে কিছুটা হতাশ হয়েছি। তারপরও আমরা বিচারকরা যতটা সম্ভব যোগ্য ও সম্ভাবনাময় প্রতিযোগীদের বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’
রিচির পছন্দে সুনেরাহ
বর্তমান প্রজন্মের অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে সুনেরাহ বিনতে কামালের কাজ রিচির বিশেষভাবে ভালো লাগে। তার মূল্যায়নে, ‘সুনেরাহর মধ্যে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তার সংলাপ বলার ধরন আলাদা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ স্বাভাবিক এবং অভিনয়ে নিজস্ব একটি ব্যক্তিত্ব ফুটে ওঠে।’
সন্তানদের নিয়ে উল্টো সিদ্ধান্ত
অনেক বাংলাদেশি পরিবার সন্তানদের নিয়ে উন্নত শিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যায়; কিন্তু রিচি সোলায়মান নিয়েছেন উল্টো সিদ্ধান্ত। যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও দুই সন্তানকে দেশীয় সংস্কৃতি, ভাষা, পারিবারিক বন্ধন ও শিকড়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে দেশে ফিরে আসেন তিনি। শুরুতে এই সিদ্ধান্তে তার স্বামী নারাজ ছিলেন। আত্মীয়-স্বজনও সমালোচনা করেছিলেন। তাদের মন্তব্য ছিল, এত কষ্ট করে বিদেশে গিয়ে আবার দেশে ফিরে আসা বোকামি; কিন্তু রিচি বিশ্বাস করতেন, তার সন্তানরা যেখানেই বড় হোক, যেন নিজেদের দেশকে কখনো না ভোলে। তার ভাষায়, ‘সন্তানরা হয়তো ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রেই থাকবে; কিন্তু তারা যেন বাংলা ভাষা, দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং আত্মীয়তার মূল্য বুঝে বেড়ে ওঠে, এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া। এখন তারা বাংলা ভাষায় কথা বলে, জাতীয় দিবস উদযাপন করে, দেশের ইতিহাস শেখে এবং ধীরে ধীরে নিজেদের শিকড়কে চিনতে শিখছে।’
এক ছেলে ও এক মেয়েকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন রিচি। দুই সন্তান বাংলাদেশের স্কুলে পড়াশোনা করছে। তার ছেলে আগামী বছর ও-লেভেল পরীক্ষা দেবে। তিনি বললেন, ‘ছেলের পরীক্ষার পর নিজের জন্য নতুন কিছু ভাববো। অভিনয়ে ফেরা কিংবা নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়ার বিষয়টি তখন বিবেচনা করব।’
অভিনয় না করলেও সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকেন রিচি। উত্তরায় নারীদের রূপচর্চার সেলুন ইটারনাল বিউটি লাউঞ্জ পরিচালনা করছেন তিনি।




