রাস্তাঘাট পরিষ্কার করা নাসিরের নেশা

ড্রেন পরিষ্কারে নেমেছেন নাসির উদ্দিন। আশপাশের ঝোপঝাড়ও পরিষ্কার করেন তিনি। ছবি: আগামীর সময়
এমন কিছু মানুষ আছেনম যারা নিজের কথা না ভেবে সমাজ এবং দেশের কথা ভাবেন, অন্যের মুখে হাসি ফুটিয়ে হন আনন্দিত। তাদের কাজের সুফল পান সবাই। তাদেরই একজন নাসির উদ্দিন (৭২)।
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার মোল্লাপুর ইউনিয়নের পাতন গ্রামের নাসির পরিবারে সচ্ছলতা আনতে ১৯৮৪ সালে পাড়ি জমান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ২০১৪ সালে দেশে ফেরেন। এরপর নেমে পড়েন গ্রামের রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে। আশপাশের অন্যরা যখন নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, তখন নাসির উদ্দিন বিনাপারিশ্রমিকে এক যুগ ধরে নিজের গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের রাস্তাঘাট এবং ড্রেন পরিষ্কার করছেন হাসিমুখে। বৃষ্টির সময় ময়লা-আবর্জনা, গাছের ডালপালা আটকে ড্রেনের পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে যখন রাস্তায় সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, তখন ড্রেনে নেমে তা পরিষ্কার করেন, ড্রেনের পাশের গাছের ডালপালা-লতাপাতা কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করেন।
দুই ছেলে ও তিন মেয়ের বাবা নাসির উদ্দিন। স্ত্রী মারা গেছেন বছরদুয়েক আগে। বর্তমানে ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন তিনি। তবু গ্রামের পর গ্রাম ছুটে বেড়াচ্ছেন ড্রেন, রাস্তার দুই পাশের কিংবা মসজিদের সামনের আবর্জনা পরিষ্কার করতে। পাতন গ্রাম ছাড়াও পাশের কটুখালীপাড়, মোল্লাপুর, আব্দুল্লাহপুর ও উছপাড়া এলাকায় তিনি পরিচ্ছন্নতার কাজ চালান।
নাসির উদ্দিনের ছেলে আলী হোসেন বললেন, ‘আমার আব্বা রাস্তাঘাট ও ড্রেন পরিষ্কার করেন মনের তৃপ্তি মেটানোর জন্য। আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি তিনি এ কাজ করছেন। একটা সময় আমিসহ আমাদের পরিবারের লোকজন বাধা দিতাম। কিন্তু তিনি সে বাধা না শুনে কখনো মসজিদের উঠান পরিষ্কার আবার কখনো গ্রামের রাস্তার দুই পাশের সৌন্দর্যবর্ধনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। মানুষ তার প্রশংসা করেন, সেটি আমাদের কাছেও ভালো লাগে। সেজন্য এখন আমরা তাকে আর বাধা দিই না।’
পাতন-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলী হোসেন মুন্না বললেন, ‘বৃষ্টির সময় ড্রেন উপচে পানি যখন রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন মানুষের চলাচলে কষ্ট হয়। নাসির চাচা এসে বৃষ্টিতে ভিজে ড্রেন পরিষ্কার করে দেন, যাতে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।’
পাতন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল করিম বলছিলেন, নাসির উদ্দিন অন্যদের চেয়ে ব্যতিক্রম। তিনি চাইলে এ বয়সে আরাম-আয়াসের জীবন উপভোগ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে মানুষের হাঁটাচলার সুবিধার জন্য বিনাপারিশ্রমিকে রাস্তাঘাট, আগাছা পরিষ্কার করছেন, গাছের ডালপালা কেটে দিচ্ছেন— যাতে মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি না হয়। এমন মহৎ কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়।
মোল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানের ভাষ্য, নাসির চাচা বিনাপারিশ্রমিকে কাজ করেন সমাজের জন্য, যা বর্তমানে কেউ করতে চায় না। ইউপির পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় পরিষদের পক্ষ থেকে সবসময় ড্রেন পরিষ্কার করা সম্ভব হয় না। কিন্তু নাসির চাচার ওয়ার্ডে তিনি বৃষ্টির সময় কারও অপেক্ষা না করে ড্রেন পরিষ্কার করার দায়িত্ব নিজেই নেন। এরকম মানুষ প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকলে সমাজের মানুষ উপকৃত হতো।
নাসির উদ্দিন মনে করেন, ‘আমার সামনের পরিবেশ যদি আমি সুন্দর না রাখি, তাহলে তা সুন্দর হবে কীভাবে। কেউ না কেউ তো দায়িত্ব নিতে হবে। আমি এসব কাজ করে শান্তি পাই, সেজন্য করি। অন্যের অপেক্ষায় বসে থাকতে আমি পছন্দ করি না। যতটুকু সম্ভব নিজে করার চেষ্টা করি। আর যা সম্ভব না হয়, তা অন্যদের সাহায্য নিয়ে করার চেষ্টা করি। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এ কাজটাই করব, যাতে আমার আশপাশের মানুষ সুন্দর পরিবেশে চলাফেরা করতে পারেন।’




