ক্ষুধা আর হতাশায় থামল ইউরোপযাত্রা
সেউতার স্বপ্নভঙ্গ, ফিরছেন হাজারো অভিবাসী

ছবি: রয়টার্স
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ইউরোপের ঝলমলে জীবনের স্বপ্ন নিয়ে মরক্কো থেকে স্পেনের ছিটমহল সেউতায় পাড়ি দিয়েছিলেন হাজার হাজার তরুণ। কিন্তু বাস্তবের সেউতায় তাদের অপেক্ষা করছিল না কাঙ্ক্ষিত সুযোগ–ছিল অনাহার, ক্লান্তি, অনিশ্চয়তা আর প্রত্যাখ্যানের অভিজ্ঞতা। শেষ পর্যন্ত ক্ষুধা, দুর্দশা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন মরক্কোয়।
গত কয়েক দিনে সেউতায় অভিবাসীর অভূতপূর্ব ঢলের পর পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে। মরক্কো থেকে প্রায় ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার মানুষ স্পেনের এই ছোট্ট ভূখণ্ডে প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁদের বড় অংশই পরে স্বেচ্ছায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। স্পেনের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়েক দশ হাজার মানুষ ফিরে যাওয়ার পর সীমান্তে চাপ কিছুটা কমেছে।
কিন্তু ফিরে যাওয়া মানুষদের মুখে উঠে এসেছে এক ভিন্ন গল্প–যে গল্প সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ইউরোপের স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতার তীব্র ফারাক দেখায়।
মরক্কোর ফেজ শহরের এক বেকারি কর্মী ব্রাহিম জানান, সেউতায় পৌঁছে কয়েক দিন প্রায় শুধু পানি খেয়ে কাটাতে হয়েছে তাকে। সামাজিক মাধ্যমে যে সহজ পথে ইউরোপে পৌঁছানোর ছবি দেখেছিলেন, বাস্তবে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। খাবারের সংকট, দোকান বন্ধ থাকা এবং অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তাঁকে হতাশ করে।
অনেক অভিবাসীর অভিযোগ, সেউতার কিছু এলাকায় স্থানীয়দের কাছ থেকেও বিরূপ আচরণের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের। বিশেষ করে এল প্রিন্সিপে এলাকার পরিস্থিতি নিয়ে অনেকে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যদিও এসব অভিযোগের সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
সামাজিক মাধ্যমেই কি তৈরি হচ্ছে ‘ইউরোপের মায়া’?
এই অভিবাসন ঢলের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মরক্কোর একটি সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, তরুণদের একটি বড় অংশ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অভিবাসন-সংক্রান্ত কনটেন্ট দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
হেসপ্রেসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, একটি অধিকার সংগঠনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মরক্কোর ৮১ শতাংশ তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অভিবাসন-সংক্রান্ত কনটেন্টের প্রভাবে প্রভাবিত হন। এই ধরনের ভিডিও ও পোস্টে অনেক সময় ইউরোপের জীবনকে অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরা হয়, কিন্তু বিপজ্জনক যাত্রা, আইনি বাধা এবং বাস্তব সংগ্রামের বিষয়গুলো আড়ালে থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফেসবুক, টিকটক ও ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া কিছু কনটেন্ট তরুণদের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি করে যে ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই জীবনের সব সমস্যা মিটে যাবে। অথচ বাস্তবে অনেকে সীমান্তে আটক হন, আইনি জটিলতায় পড়েন অথবা মানবিক সংকটের মুখোমুখি হন।
সেউতার পথে কেন এত আকর্ষণ?
উত্তর আফ্রিকার উপকূলে অবস্থিত সেউতা ভৌগোলিকভাবে মরক্কোর খুব কাছে হলেও এটি স্পেনের অংশ এবং এর মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়। এই কারণেই বহু বছর ধরে এটি আফ্রিকা থেকে ইউরোপে যাওয়ার অন্যতম আকাঙ্ক্ষিত পথ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই পথ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অনেকেই সমুদ্র সাঁতরে, সীমান্ত বেড়া টপকে বা বিপজ্জনক উপায়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন। সাম্প্রতিক সংকটেও বহু মানুষের প্রাণহানি হয়েছে।
ফিরে যাওয়া মানেই কি স্বপ্নের শেষ?
সেউতা থেকে ফিরে যাওয়া অনেকের জন্য হয়তো সাময়িক বিরতি। কারণ মরক্কোর বহু তরুণের কাছে ইউরোপ এখনও উন্নত জীবন, চাকরি এবং নিরাপত্তার প্রতীক।
তবে এই সংকট আবারও দেখিয়ে দিল–ডিজিটাল পর্দায় দেখা ইউরোপ আর বাস্তবের ইউরোপ এক নয়। সামাজিক মাধ্যমের কয়েক মিনিটের ভিডিও যে স্বপ্ন তৈরি করে, সীমান্তের কঠিন বাস্তবতা অনেক সময় তা ভেঙে দেয় মুহূর্তেই।
সেউতার ঘটনা তাই শুধু একটি অভিবাসন সংকট নয়; এটি তরুণ প্রজন্মের আশা, হতাশা এবং ডিজিটাল যুগের মায়াজগতেরও একটি প্রতিচ্ছবি।




