ফ্রান্সে ১৭৪৭ শিক্ষার্থী গ্রেপ্তার, ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে অভিভাবকদের

গতকাল শুক্রবারের কর্মসূচি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৭৪৭ জনকে। ছবি: রয়টার্স
ফ্রান্সে শিক্ষার মান ও স্কুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে ক্রমেই অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। গতকাল শুক্রবারও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে বিক্ষোভকারীদের। দেশটির ৭০০টির বেশি স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছে এ বিক্ষোভ। এদিনের কর্মসূচি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১ হাজার ৭৪৭ জনকে।
শিক্ষক সংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ও জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের প্রতিবাদে গত সপ্তাহে রাজধানী প্যারিসে শুরু হয় এই বিক্ষোভ। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে। মন্টপেলিয়ে, নঁত ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে হয়েছে বিক্ষোভ। কোথাও কোথাও সড়কে জ্বালানো হয়েছে আগুন।
ফ্রান্সের আইনমন্ত্রী জেরাল দারমানাঁ জানিয়েছেন, দেশটির ৩ হাজার ৭০০ স্কুলের মধ্যে ৭৩৫টি কোনো না কোনোভাবে সহিংস বিক্ষোভে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার ভাষ্য, পরিস্থিতি এখন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর্যায় পেরিয়ে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার দিকে চলে গেছে।
গতকাল শুক্রবার রাতে গ্রেপ্তারের সংখ্যা জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ। ফ্রান্সের টিএফ-১ টেলিভিশনকে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি দাঙ্গা ও সহিংসতার দিকে এগোচ্ছে। এটি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তবে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে দাবি করেছেন, বিক্ষোভে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অন্যরাও যুক্ত হয়ে পড়েছেন। ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম বিএফএমটিভিকে তিনি বলেছেন, শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তাদের সামনে থাকা অনেকেই তাদের শিক্ষার্থী নয়।
শুক্রবার উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের বেলফোর শহরে বিক্ষোভের সময় এক পুলিশ কর্মকর্তাকে লক্ষ্য করে হামলার ঘটনায় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে হত্যাচেষ্টার সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বিবিসি ভেরিফাই জানিয়েছে, ওই কর্মকর্তাকে মারধরের দুটি ভিডিও তারা যাচাই করে সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ভিডিওতে কয়েকজন তরুণকে ওই কর্মকর্তাকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তিনি মাটিতে পড়ে গেলে তাকে মাথায় ঘুসি ও লাথি মারা হয়। পরে এক মন্ত্রী জানিয়েছেন, হামলার শিকার ব্যক্তিটি পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চলমান অস্থিরতায় অন্তত ৬৫ জন স্কুলের কর্মী আহত হয়েছেন।
প্যারিসের উপকণ্ঠ পান্তাঁ শহরে পুলিশের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া হলে বিক্ষোভকারীদের পুলিশ ধাওয়া করে। কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্ট্রাসবুর্গে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে আশঙ্কায় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেছে।
এদিকে, গ্রেপ্তার বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে জব্দ করা বিভিন্ন সামগ্রীর ছবিও প্রকাশ করেছে পুলিশ। এর মধ্যে পেট্রলবোমা, কুঠার এবং মর্টার আতশবাজি রয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, স্কুলের গেট, প্রবেশপথ ও দেয়ালে হামলার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি চিহ্নিত করা হয়েছে।
নঁতের নেলসন ম্যান্ডেলা হাইস্কুলে আগুনে কাচের দরজা ও ভবনের ভেতরের বেশকিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আঞ্চলিক সরকারের হিসাবে, এতে ক্ষতির পরিমাণ ২০ লাখ ইউরোর বেশি।
গত সপ্তাহে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন দেশটির শত শত স্কুলে ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, স্কুলে তাদের দীর্ঘ সময় থাকতে হয়। কিন্তু তাদের শ্রেণিকক্ষগুলোয় থাকে অতিরিক্ত গরম। এ ছাড়া অনেক শিক্ষক ও কর্মী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকছেন না।
শিক্ষা খাতে প্রস্তাবিত বাজেট কাটছাঁট নিয়েও শিক্ষার্থীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ক্ষোভ। আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে এ বিক্ষোভ ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর জন্য বড় সংকট হিসেবে দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
বিক্ষোভের মধ্যে সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা। দক্ষিণ প্যারিসের ক্লদ মোনে স্কুলে ৫৩ বছর বয়সী আনিয়া বিক্ষোভের মধ্যে তার ছেলেকে খুঁজতে এসেছিলেন।
এএফপিকে আনিয়া জানিয়েছেন, তারা ছেলেকে স্কুলে আসতে নিষেধ করেছিলেন। তবু সে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেছে।
বিক্ষোভে সন্তানদের হাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার দায় অভিভাবকদের দিয়েছেন আইনমন্ত্রী দারমানাঁ। তিনি বলেছেন, ‘সন্তানদের হাতে হওয়া ক্ষয়ক্ষতির দায় অভিভাবকদের নিতে হবে। মেরামতের খরচও তাদের পরিশোধ করতে হবে। এ বিষয়ে প্রসিকিউটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।‘
এদিকে, ফ্রান্সের বেশ কয়েকটি শ্রমিক সংগঠন বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। শিক্ষা ইউনিয়ন এসএনইপি-এফএসইউ, সরকারি পরিষেবা ইউনিয়ন এসএনইউইপি-এফএসইউ এবং সলিডেয়ার্সের পক্ষ থেকে সদস্যদের শিক্ষার্থীদের সমর্থনে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
সলিডেয়ার্স ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আমাদের সন্তানদের ওপর হামলা হতে দেওয়া যাবে না।’ তাদের ভাষ্য, মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সমাবেশ, সংগঠন ও বিক্ষোভ করার স্বাধীনতা রয়েছে।
সূত্র : বিবিসি








