ছাত্র আন্দোলনের মুখে পদ ছাড়লেন সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ভুসিচ, পেছনে কী

সদ্য পদত্যাগ করা সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুসিচ। ফাইল ছবি/ রয়টার্স
ছাত্রনেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের মধ্যেই রবিবার সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্ডার ভুসিচ পদত্যাগ করেছেন। আগামী ২৫ অক্টোবরের আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী পদে প্রার্থী হতে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় সাত মাস আগেই তিনি পদ ছাড়লেন।
ভুসিচের পদত্যাগের পর পার্লামেন্টের স্পিকার আনা ব্রনাবিচ ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেবেন। সংবিধান অনুযায়ী, ভুসিচ তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হতে পারেন না। তাই এবার পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টির (এসএনএস) হয়ে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছেন তিনি।
আগামী ২৫ অক্টোবর পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর ভুসিচ পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে আগাম নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। তার পদত্যাগের পর দেশটিতে আলাদা করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনও হবে।
পদ ছাড়ার আগে ভুসিচ ৪৯ জনকে ক্ষমা করেছেন। তাদের মধ্যে বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনায় দণ্ডিত ২৩ জনও রয়েছেন।
২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন ভুসিচ। এবার তার পদত্যাগ এমন সময়ে হলো, যখন প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্রদের বিক্ষোভ তার সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
কেন পদ ছাড়লেন ভুসিচ
ভুসিচের পদত্যাগকে শুধু প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরে দাঁড়ানো হিসেবে দেখলে সার্বিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। মূল বিষয় হলো, প্রেসিডেন্ট পদ ছাড়লেও তিনি রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছেন না। বরং ক্ষমতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ—প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে এগোচ্ছেন।
সার্বিয়ার সংবিধান অনুযায়ী তৃতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়া তার জন্য সম্ভব নয়। ফলে প্রেসিডেন্ট পদে থেকে ক্ষমতা ধরে রাখার সুযোগ তার ছিল না। ২৫ অক্টোবরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে এসএনএস জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পাবেন।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে দীর্ঘদিনের ছাত্র আন্দোলন। ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোভি সাদের একটি রেলস্টেশনের কংক্রিটের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে সেই আন্দোলন দেশের অন্যতম বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়।
বিক্ষোভকারীরা দুর্নীতি, সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলেছেন। তাদের দাবি ছিল, ওই রেলস্টেশন দুর্ঘটনার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। ভুসিচ ও তার মিত্ররা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
ছাত্র আন্দোলন এবার শুধু রাস্তায় প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ‘স্টুডেন্টস উইন’ নামে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। তাদের সঙ্গে কয়েকটি বিরোধী দলও রয়েছে। তালিকায় ২৫০ জন প্রার্থী রয়েছেন, যাদের বড় অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষ।
তাদের নির্বাচনী কর্মসূচিতে দুর্নীতির তদন্ত, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ খতিয়ে দেখা, সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং সরকারি অর্থ ব্যবহারে আরও স্বচ্ছতার দাবি রয়েছে।
নির্বাচনই কেন গুরুত্বপূর্ণ
ভুসিচ আগাম নির্বাচন ডাকলেও সার্বিয়ার রাজনৈতিক সংকট সেখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং নির্বাচনটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক আধিপত্যের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
বেলগ্রেডের রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেজান ইলিচ বলেছেন, আগাম নির্বাচনকে শুধু ভুসিচের স্বেচ্ছায় নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। তার ভাষায়, মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন দাবি করেছে এবং সেই চাপ থেকেই নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ভুসিচ অবশ্য বলেছেন, বিরোধীরা নির্বাচনে জিতলে তিনি ফল মেনে নেবেন এবং সেদিনই তাদের অভিনন্দন জানাবেন।
ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত শক্তিগুলো নির্বাচনে কতটা সমর্থন পায়, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কয়েকটি জরিপে তাদের শক্ত অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে এসব জরিপের উৎস ও পদ্ধতি নিয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই নির্বাচনের ফল সম্পর্কে আগাম কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
সংকটের শুরু কোথায়
নোভি সাদের রেলস্টেশন দুর্ঘটনা ছিল দীর্ঘদিনের অসন্তোষের প্রতীকী ঘটনা মাত্র। ২০২৪ সালের নভেম্বরে ছাদ ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামে। পরে তাদের সঙ্গে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ যোগ দেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ— অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। সরকার এসব অভিযোগের দায় অস্বীকার করেছে।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা আন্দোলনের ফলে ভুসিচের সরকারকে আগাম নির্বাচনের পথে যেতে হয়েছে। এখন সেই নির্বাচনই ঠিক করবে, তার রাজনৈতিক প্রভাব আগের মতো থাকবে কি না এবং তিনি প্রেসিডেন্টের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ফেরার সুযোগ পাবেন কি না।
সার্বিয়ার বাইরেও কেন নজর
এ নির্বাচন শুধু সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। পশ্চিম বলকান অঞ্চলে সার্বিয়ার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, মন্টেনেগ্রো ও কসোভোয় বসবাসকারী সার্ব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বেলগ্রেডের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সার্বিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনীতিতেও পড়তে পারে।
বসনিয়ার বানিয়া লুকায় ফ্রিডরিখ এবার্ট ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ের প্রধান তানিয়া টপিচ বলেছেন, সার্বিয়ার রাজনীতির দিক পরিবর্তন হলে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করেছেন, এমন পরিবর্তন রাতারাতি হবে না।
অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার চাপ
প্রায় ৬০ লাখ মানুষের দেশ সার্বিয়া পশ্চিম বলকানের সবচেয়ে বড় দেশগুলোর একটি। ভুসিচ তার শাসনামলে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন। চীনের বিনিয়োগ, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ এবং সাম্প্রতিক ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতাকে তিনি অর্থনৈতিক সাফল্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে প্রতিবেশী ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় সার্বিয়ার গড় মজুরি এখনো কম। সরকারি হিসাবে, এ বছরের এপ্রিলে সার্বিয়ায় গড় মাসিক নিট বেতন ছিল ১ হাজার ৩২ ইউরো। প্রতিবেশী ক্রোয়েশিয়ায় তা ছিল ১ হাজার ৫৫৫ ইউরো। অর্থাৎ দুই দেশের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৫১ শতাংশ।
জীবনযাত্রার এই পার্থক্যও নির্বাচনের আগে সার্বিয়ার জনআলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের ঐতিহাসিক সূত্র
সার্বিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে দেশটির ১৯৯০-এর দশকের যুদ্ধের উত্তরাধিকারও জড়িয়ে আছে।
দুই দশকেরও বেশি আগে কসোভো যুদ্ধের সময় তৎকালীন যুগোস্লোভিয়ার বিরুদ্ধে ন্যাটো বিমান হামলা চালিয়েছিল। তখন দেশটির নেতৃত্বে ছিলেন স্লোবোদান মিলোশেভিচ। বসনিয়া ও কসোভো যুদ্ধের স্মৃতি এখনো সার্বিয়ার রাজনীতিতে স্পর্শকাতর বিষয়।
চলতি সেপ্টেম্বরের শুরুতে বসনিয়ার সার্ব বাহিনীর সাবেক কমান্ডার রাতকো ম্লাদিচকে বেলগ্রেডে দাফন করা হয়। বসনিয়া যুদ্ধে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে দণ্ডিত ম্লাদিচের শেষকৃত্যে কয়েকজন সার্ব মন্ত্রীও উপস্থিত ছিলেন এবং সামরিক সম্মান জানানো হয়।
এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সমালোচনা হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কায়া কালাস ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেয়েন বলেছেন, যুদ্ধাপরাধকে মহিমান্বিত করার জায়গা ইউরোপে নেই।
ফলে ২৫ অক্টোবরের নির্বাচন শুধু ভুসিচের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভোট নয়। সার্বিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির পাশাপাশি দেশটি পশ্চিম বলকানে কোন পথে এগোতে চায়, সেই প্রশ্নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
সূত্র : আল জাজিরা







