সেউতায় পরিচয় যাচাই শুরু, সিদ্ধান্ত নেবে স্পেন

ছবি: রয়টার্স
মরক্কো থেকে নজিরবিহীন জনস্রোতের পর স্পেননিয়ন্ত্রিত সেউতায় এবার শুরু হয়েছে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের পরিচয় যাচাই ও আশ্রয় আবেদন পর্যালোচনার প্রক্রিয়া। এখনও সেখানে অবস্থান করা প্রায় আড়াই হাজার মানুষের মধ্যে কারা আন্তর্জাতিক সুরক্ষা পাবেন এবং কাদের মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে স্পেনের জাতীয় পুলিশ।
গত সপ্তাহে মরক্কো থেকে আনুমানিক ৭২ হাজার মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে সেউতায় প্রবেশ করেছিলেন। স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৭০ হাজার ইতিমধ্যে স্বেচ্ছায় অথবা স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনায় মরক্কোয় ফিরে গেছেন। বাকি ব্যক্তিদের আইনি অবস্থান নির্ধারণের কাজ চলছে।
পরিচয়, বয়স, নাগরিকত্ব, সীমান্ত অতিক্রমের কারণ এবং নিজ দেশে ফিরে গেলে নির্যাতনের ঝুঁকি রয়েছে কি না—এসব বিষয় প্রাথমিক যাচাইয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। যাঁরা আন্তর্জাতিক আশ্রয়ের আবেদন করবেন, তাঁদের আবেদন পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা হবে। আবেদন গ্রহণ হলে আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেউতায় থাকার সুযোগ মিলবে। আর আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁদের মরক্কোয় ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয়নীতি অনুযায়ী সীমান্তেই দ্রুত পরিচয় যাচাই, আবেদন নিষ্পত্তি এবং প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের জুন থেকে কার্যকর হওয়া এই ব্যবস্থায় ডিজিটাল নিবন্ধন ও দ্রুত সিদ্ধান্তের বিধান রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর আশঙ্কা, দ্রুততার কারণে আবেদনকারীদের ব্যক্তিগত ঝুঁকি সব সময় যথাযথভাবে মূল্যায়িত নাও হতে পারে।
সেউতায় সবচেয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে অভিভাবকহীন শিশুরা। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাবে, আগে থেকে থাকা এবং সাম্প্রতিক সময়ে আসা মিলিয়ে প্রায় এক হাজার ১০০ অভিভাবকহীন শিশু বর্তমানে সেখানে রয়েছে। স্পেনের আইন অনুযায়ী, বয়স ও পরিচয় নিশ্চিত না করে তাঁদের ফেরত পাঠানো যায় না।
অভ্যর্থনাকেন্দ্রগুলোতে জায়গার সংকট থাকায় অনেক শিশুকে অস্থায়ী গুদামঘরে রাখা হয়েছে। কেউ কেউ খোলা আকাশের নিচেও রাত কাটাচ্ছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বাসিন্দারা খাবার, কম্বল এবং অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছে সেউতার প্রশাসন।
এই সংকট মোকাবিলায় শিশুদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানান্তরের আবেদন জানিয়েছে সেউতা সরকার। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দেখভালের জন্য আড়াই কোটি ইউরো বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। তবে রক্ষণশীল ও অতি-ডানপন্থী দল পরিচালিত কয়েকটি আঞ্চলিক সরকার শিশুদের গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছে।
মরক্কো ও স্পেনের কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সীমান্ত পার হওয়ার সময় সাঁতার কাটা, অতিরিক্ত ভিড় এবং সীমান্তের বেড়া টপকানোর চেষ্টায় ৮০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে মরক্কোর ফনিদেক সীমান্তে এখনও বহু পরিবার নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে অপেক্ষা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত খুলে দেওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ার পরই হাজার হাজার মানুষ সেউতার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। ইউরোপে কাজ ও নিরাপদ জীবনের আশায় সীমান্ত পেরোলেও খাবার, আশ্রয় ও আইনি সুযোগের অভাবে তাঁদের অধিকাংশই কয়েক দিনের মধ্যে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
এখন সিদ্ধান্ত স্পেনের
সীমান্তে আপাতত নতুন করে জনস্রোত নেই। তবে সেউতায় থেকে যাওয়া মানুষের অনিশ্চয়তা এখনও কাটেনি। প্রাপ্তবয়স্কদের আশ্রয় আবেদন, শিশুদের পরিচয় ও বয়স যাচাই এবং মরক্কোর সঙ্গে প্রত্যাবর্তন প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে দীর্ঘ আইনি ও মানবিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি স্পেন।
যাঁদের আবেদন গ্রহণ করা হবে, তাঁদের সামনে ইউরোপে সুরক্ষা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর যাঁদের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে, তাঁদের ফিরে যেতে হবে মরক্কোয়। সীমান্ত পেরোনোর উত্তেজনা শেষ হলেও এখন হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কয়েকটি সাক্ষাৎকার, প্রয়োজনীয় নথি এবং স্পেনীয় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর।




