ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি
কত কাছে তবু বহুদূর

সন্ধির সড়কে কোথায় যেন একটা বড় জটলা পাকিয়ে ফেলছে দুপক্ষই। কখনো ইরান, কখনো যুক্তরাষ্ট্র। বারবারই থমকে যাচ্ছে শান্তিযাত্রার সব আয়োজন। গত কয়েক সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতির শোরগোল চলছিল দুদেশেই। দরকষাকষি-টানাহেঁচড়ার টানাপড়েনে শনিবার আশার আলো ফুটেছিল মধ্যপ্রাচ্যের রণাকাশে। পরদিন রবিবারও বিশ্বগণমাধ্যমের পুরোটা জুড়ে ছিল ‘চুক্তির খুব কাছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র’। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখ থেকেই আসে সে ঘোষণা। কিন্তু দিন ডুবতেই আবার সেই ‘কালো মেঘ’। অনিশ্চয়তা, ধোঁয়াশা! ‘সাফল্যের’ খুব কাছাকাছি গিয়েও আটকে গেল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তি। খসড়ার বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ের অমীমাংসিত ইস্যুতে পিছলে গেল সব। ‘চাওয়া-পাওয়া’র লাভ-লোকসানের হিসাবে আবারও হয়তো ‘বহুদূর’ চলে গেল মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি!
‘আজই সই হতে পারে যুদ্ধবিরতি চুক্তি’— গতকাল সোমবারও দিল্লি থেকে এ কথা বলেছিলেন চার দিনের ভারত সফরে আসা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। অথচ ঘটল তার উল্টো। কারণ ব্যাখ্যা না করেই ‘আজ চুক্তি হচ্ছে না’ জানিয়ে দিল ইরান।
প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি চলাকালীন খুলে দেওয়া হবে হরমুজ প্রণালি। বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ দিয়ে টোল থাকবে না জাহাজ চলাচলে। হরমুজের মাইন অপসারণ করবে ইরান। তেহরানের বন্দরগুলো থেকে অবরোধ তুলে নেবে ওয়াশিংটন। ইরানের জ্বালানি তেল নিষেধাজ্ঞায়ও কিছু ছাড় দেবে যুক্তরাষ্ট্র। কখনো পারমাণবিক অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা করবে না— সেই প্রতিশ্রুতি দেবে ইরান। জব্দ করা ইরানের বিভিন্ন তহবিল থেকে অর্থ পাওয়ার সুযোগ দেবে যুক্তরাষ্ট্র। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করবে ওয়াশিংটন।
তবে ইরান বলছে, এখনো অনেক বড় বড় বিবাদ মেটানো বাকি। তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তারা ছাড়বে না। মানবে না ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার মার্কিন শর্তও। সেই সঙ্গে ইরানের দাবি, বড় কোনো চুক্তিতে যাওয়ার আগে তাদের ওপর থেকে তুলতে হবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা। ফেরত দিতে হবে আটকে থাকা টাকা।
এরই মধ্যে আবার জল ঘোলা করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। পাশাপাশি লেবানন সমস্যা এবং বাস্তবে এই যুদ্ধবিরতি কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। নতুন এই জট বাঁধার বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন বিশ্লেষকরা। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো টোল ছাড়াই জাহাজ চলুক হরমুজে। কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি ছাড়তে নারাজ ইরান।
দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করা বন্ধ করুক ইরান। হস্তান্তর করুক মজুদ ইউরেনিয়াম। এখনই এই দাবি মানতে রাজি নয় ইরান। তারা চায় আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার। আটকে থাকা অর্থ ফেরত। প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার।
কিন্তু এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক বেশি সতর্কতামূলক। জব্দ করা সম্পদ ছাড়ে রাজি হয়নি এখনো। বলেছে, শর্ত মানলে পরে বিবেচনা। ইরানের পরমাণু ক্ষমতারও পুরোপুরি ধ্বংস চায় ওয়াশিংটন। সরাসরি নাকচ করেছে তেহরান। এটিই হলো সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত বিষয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মতে, ইরানের কাছে বর্তমানে ৬০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় সমৃদ্ধ প্রায় ৯৭০ পাউন্ড ইউরেনিয়াম। আর এর চেয়ে কম মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে প্রায় ১১ টন
আরেকটি অমীমাংসিত বিষয় হলো লেবাননের হিজবুল্লাহসহ ইরানের আঞ্চলিক সশস্ত্র মিত্রদের নেটওয়ার্ক। ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থা লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করবে। কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে নিশ্চিত করেননি যে, ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো এই আলোচনার অংশ। ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয়— ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার ওপর সীমা আরোপের দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু এক মার্কিন কর্মকর্তা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, বর্তমানে আলোচনাধীন খসড়া চুক্তির অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র অন্তর্ভুক্ত নয়।






