রঙিন ডানার পৃথিবী

খুবির ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. শরীফ হাসান লিমন ও গবেষণা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন তুহিন।
প্রজাপতি নিয়ে গবেষণা করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজির অধ্যাপক ড. শরীফ হাসান লিমন ও গবেষণা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন তুহিন। লিখেছেন- মিরাজুল ইসলাম
ভোরের আলো ফোটার পর খুলনার গ্রামে গ্রামে দেখা যায় দূরে ধানক্ষেত, কোথাও পাটের সবুজ, কোথাও মাছের ঘের, কোথাও রাস্তার ধারে নাম না জানা বুনো ফুল। শিশিরভেজা ঘাসের ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়ার পর খুব মনোযোগ দিয়ে তাকালে দেখা যায়, একটি ফুল থেকে আরেকটি ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে ছোট ছোট রঙিন প্রজাপতি। তারা সৌন্দর্যের প্রতীক। শিশুর আঁকার খাতায়, কবিতায়, গল্পে কিংবা বসন্তের ছবিতে প্রজাপতি রঙ ছড়ায়। কিন্তু প্রকৃতির কাছে প্রজাপতির পরিচয় শুধু সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়; সুস্থ পরিবেশ, জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র এবং উদ্ভিদের প্রজননের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে প্রাণীটি। তাদের নীরব ভূমিকার বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে খুলনা অঞ্চল জুড়ে পরিচালিত গবেষণায়। সেটি করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শরীফ হাসান লিমন এবং একই ডিসিপ্লিনের সাবেক ছাত্র ও গবেষণা কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন তুহিন।
গবেষণাটি খুলনা জেলার ১০টি প্রশাসনিক উপজেলা জুড়ে পরিচালিত হয়। ফলাফল অবাক করার মতো। পুরো জেলায় রেকর্ড করা হয়েছে ৫৩টি প্রজাতির প্রজাপতি। প্রজাতিগুলো ৪৪টি জেনাস (গন) ও ছয়টি ভিন্ন গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। সংখ্যাটি বাংলাদেশের মোট পরিচিত প্রজাপতি প্রজাতির প্রায় ১৪ শতাংশ। খুলনাঞ্চলে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রজাপতির উপস্থিতি রয়েছে। এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক সমৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ তারা। তবে প্রজাপতির বৈচিত্র্য খুলনার সব জায়গায় সমান নয়। গবেষণায় সবচেয়ে সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে উঠে এসেছে খুলনা সদর উপজেলা, যেখানে ৪১টি প্রজাতির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয়েছে। ফুলতলায় ৩৬টি, পাইকগাছায় ৩৪টি, দাকোপ ও কয়রায় ৩১টি করে, রূপসা ও তেরখাদায় ৩০টি করে, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটায় ২৯টি করে এবং ডুমুরিয়ায় ২৮টি প্রজাতি পাওয়া গেছে। সংখ্যার এই পার্থক্যের কারণ আবাসস্থলের ভিন্নতা, উদ্ভিদের বৈচিত্র্যের তারতম্য, খাদ্যের প্রাপ্যতার ভিন্নতা এবং মানুষের ভূমি ব্যবহারের ধরনের পার্থক্য।
প্রজাপতিরা কোথায় থাকতে সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে? অনেকের ধারণা, ঘন বনই বুঝি তাদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কিন্তু গবেষকরা বলেন, খুলনার ঘাসভূমি ও ফসলি জমিতেই প্রজাপতির বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। গ্রামের আইল, পতিত জমি, ঝোপঝাড়, বুনো ফুলে ভরা ছোট ছোট সবুজ এলাকাই তাদের প্রিয় আবাস। সুন্দরবনসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বন ও জলাভূমিতে প্রজাপতির প্রজাতির সংখ্যা তুলনামূলক কম।
অধিকাংশ প্রজাপতি এমন পরিবেশ পছন্দ করে, যেখানে পর্যাপ্ত সূর্যালোক ও প্রচুর ফুল থাকে এবং লার্ভার জন্য উপযোগী খাদ্য উদ্ভিদ পাওয়া যায়। ঘাসভূমি ও কৃষিজমির আশপাশে সেই পরিবেশ সহজেই তৈরি হয়। তাই গ্রামবাংলার একটি ছোট্ট ফুলের বাগান অনেক সময় প্রজাপতির কাছে গভীর বনের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়।
গবেষণায় রেকর্ড করা ৫৩টি প্রজাতির মধ্যে ২০টির সুন্দরবনের পরিচিত প্রজাপতির তালিকার সঙ্গে মিল রয়েছে। বাকি ৩৩টি প্রজাতি সুন্দরবনের সেই তালিকার বাইরে, অর্থাৎ খুলনার মূল ভূখণ্ড নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে প্রজাপতির জন্য একটি সমৃদ্ধ আবাসস্থল।
গবেষক অধ্যাপক ড. শরীফ হাসান লিমনের মতে, প্রজাপতির জীবনচক্র প্রকৃতির অন্যতম বিস্ময়কর রূপান্তরের উদাহরণ। এর জীবন শুরু হয় ডিম দিয়ে। স্ত্রী প্রজাপতি উপযুক্ত পোষক উদ্ভিদের পাতায় ডিম পাড়ে, যেখান থেকে তিন-সাত দিন পর শূককীট বা লার্ভা বের হয়। শূককীট প্রচুর পাতা খেয়ে ১০ থেকে ২১ দিনের মধ্যে দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং চার-পাঁচবার খোলস বদলায়। ৭ থেকে ১৪ দিনে শূককীট পিউপায় রূপান্তরিত হয়। পিউপা অঙ্গ গঠনের পর ২০ থেকে ৪০ দিনে ডানা শুকিয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি ওড়ার ক্ষমতা অর্জন করে। এরপর ফুলের মধু সংগ্রহ, প্রজনন এবং নতুন করে ডিম পাড়ার মাধ্যমে অন্য প্রজাপতির একই জীবনচক্র আবার শুরু হয়, যা প্রকৃতির ধারাবাহিকতা ও জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রজাপতি সারা দিন সমানভাবে উড়ে বেড়ায় না। দিনের নির্দিষ্ট সময়ে এদের সক্রিয়তা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৩টা থেকে সূর্যাস্তের আধা ঘণ্টা আগ পর্যন্ত তারা সবচেয়ে বেশি ওড়াউড়ি করে এবং ফুলে ফুলে মধু সংগ্রহ করে। এ সময় আলো ও তাপমাত্রা তাদের চলাচলের জন্য সবচেয়ে অনুকূল থাকে।
গবেষণায় রেকর্ড করা ৫৩টি প্রজাতির মধ্যে ১৭টি খুব সাধারণ। মাঠে-ঘাটে প্রায়ই দেখা যায় এদের। ১২টি সাধারণ, ১৫টি তুলনামূলক কম দেখা যায় এবং ৯টি বিরল। অর্থাৎ খুলনার প্রকৃতিতে এমন কিছু প্রজাপতিও রয়েছে, যাদের দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।
প্রজাপতির অন্যতম দিক হলো পরাগায়ন। ফুল থেকে ফুলে উড়ে বেড়ানোর সময় তারা অজান্তেই পরাগ বহন করে। এর ফলে অনেক উদ্ভিদের প্রজনন সম্ভব হয়। যদিও মৌমাছির মতো তারা প্রধান পরাগবাহক নয়, তবুও অসংখ্য বুনো উদ্ভিদ ও ফুলের প্রজননে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে তারা পাখি, টিকটিকি, ব্যাঙ এবং অন্য ছোট প্রাণীর খাদ্য। খাদ্যশৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তারা।
বিজ্ঞানীরা প্রজাপতিকে পরিবেশের ‘জীবন্ত সূচক’ বলে উল্লেখ করেন। কোনো এলাকায় প্রজাপতির সংখ্যা কমে যাওয়া অনেক সময় সেই এলাকার পরিবেশগত অবনতির ইঙ্গিত দেয়। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, বুনো ফুল ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে ফেলা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস সবকিছুর প্রভাব এই সংবেদনশীল প্রাণীর ওপর প্রথমেই পড়ে।
তবু আশার কথা হলো, এই গবেষণা অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, খুলনা এখনো প্রজাপতির জন্য সমৃদ্ধ অঞ্চল। অর্থাৎ এখনই যদি ঘাসজমি, ঝোপঝাড়, দেশীয় ফুলগাছ এবং প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে এই বৈচিত্র্য ভবিষ্যতেও টিকে থাকতে পারে। প্রজাপতির জন্য আলাদা করে বিশাল কোনো অভয়ারণ্যের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন ছোট ছোট সবুজ জায়গাগুলো বাঁচিয়ে রাখা। একটি প্রজাপতি হারিয়ে যাওয়া হয়তো প্রথম দেখায় তেমন কোনো ঘটনা মনে হয় না। কিন্তু সেই হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে হারিয়ে যায় বুনো ফুলের বংশবিস্তার, পাখির খাদ্য, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যের সূক্ষ্ম অংশ।








