বিশ্বের সবচেয়ে বয়স্ক প্রেসিডেন্ট
দুই মাস ধরে ‘নিখোঁজ’ ক্যামেরুনের ৯৩ বছরের প্রেসিডেন্ট

ক্যামেরুনের ৯৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট পল বিয়া। ছবি: এএফপি
দুই মাস ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন ক্যামেরুনের ৯৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট পল বিয়া। গত ৭ জুন তার দপ্তর জানিয়েছিল, ইউরোপে ‘সংক্ষিপ্ত ব্যক্তিগত সফরে’ গেছেন তিনি। তবে দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দেশে ফেরেননি প্রেসিডেন্ট। তার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে স্বাস্থ্য এবং দেশ পরিচালনা নিয়ে নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন।
গত সপ্তাহে ফরাসি বেতারকে ক্যামেরুন সরকারের মুখপাত্র রেনে এমানুয়েল সাদি জানান, পল বিয়া আছেন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এবং হাসপাতালে ভর্তি নন। তবে প্রেসিডেন্টের অবস্থান বা সফর সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই বলেও জানানো হয়।
সাদি বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পল বিয়া জীবিত আছেন’ এবং ‘শিগগিরই ফিরবেন দেশে’।
১৯৮২ সাল থেকে ক্যামেরুনের ক্ষমতায় থাকা পল বিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাষ্ট্রপ্রধানদের একজন। ১৯৮৪ সালে একদলীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি। বহুদলীয় ব্যবস্থা চালুর পর আরও ছয়বার জয়ী হয়েছেন নির্বাচনে। গত বছর ‘বিতর্কিত’ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অষ্টমবারের মতো জয়ী হন বিয়া। এর ফলে প্রায় ১০০ বছর বয়স পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে পারেন তিনি।
বিরোধীরা এ নির্বাচনকে জালিয়াতিপূর্ণ বলে অভিযোগ করেন। ভোটকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
দীর্ঘদিনের শাসনকালে বেশ কয়েকবার দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে কাটিয়েছেন বিয়া। তবে এবারের অনুপস্থিতি সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ। ক্যামেরুনে তার স্বাস্থ্য ও অবস্থান নিয়ে গুঞ্জনও নতুন নয়। জনসমক্ষে তাকে খুব কম দেখা যায়। অতীতে তার গুরুতর অসুস্থতা কিংবা মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সরকারকে একাধিকবার তা নাকচ করতে হয়েছে। ২০২৪ সালে তার স্বাস্থ্য নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা নিষিদ্ধ করে সরকার। সে-সময় বিষয়টিকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।
ক্যামেরুনের সাধারণ মানুষের কাছে বিয়ার দীর্ঘ শাসনও একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ৬৫ বছরের সাবেক শিক্ষক নফর্মি বিমে বলেন, ১৯৭০-এর দশকে প্রথম বিয়ার নাম শুনেছিলেন তিনি। তখন দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট আহমাদু আহিদজোর অধীনে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মহাসচিব ছিলেন বিয়া। ১৯৮২ সালে আহিদজো পদত্যাগ করলে ক্ষমতা নেন তিনি।
১৯৮৪ সালে বিয়া প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন বিমে। ‘আমরা বিশ্বাস করতাম, তিনি তরুণ ও গতিশীল। সুদর্শনও ছিলেন। ক্যামেরুনের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন অনেক কিছু।’
তবে কয়েক দশক ধরে একই ব্যক্তির ক্ষমতায় থাকার বিষয়টি এখন হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অনেকের কাছে। বিমের সন্তানদের বয়সও সেই দীর্ঘ শাসনের ব্যাপ্তি বোঝায়। তার বড় সন্তানের বয়স ৩২ বছর এবং ছোটটির বয়স ১৮ বছর। অর্থাৎ তাদের জীবনের পুরোটা সময়ই প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিয়া।
ইয়াউন্ডে-২ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৬ বছর বয়সী পিএইচডি গবেষক ও তরুণ সমাজের সংগঠক আবিত রিয়াসাই আচা বলেন, ‘বড় হয়ে আমি প্রেসিডেন্ট বিয়াকেই একমাত্র প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেছি। তাই তার প্রেসিডেন্ট থাকা ক্যামেরুন সম্পর্কে আমার পুরো অভিজ্ঞতারই অংশ।’
গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রথমবার ভোট দেন আচা। ৩৮ বছর বয়সী তরুণ বিরোধী প্রার্থী স্যামুয়েল হিরাম ইয়োদিকে ভোট দিয়েছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের শাসনের পর বিয়ার অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
আচা বলেন, ‘বছরের পর বছর এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় অনেক ক্যামেরুনবাসী এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কিন্তু কোনো কিছুর সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মানে এই নয় যে দেশ কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন করা বন্ধ করা উচিত।’
সংসদকে ক্যামেরুনের সাংবিধানিক পরিষদের কাছে বিষয়টি তোলার আহ্বান জানিয়েছেন গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অষ্টম অবস্থানে থাকা ইয়োদি। তার প্রশ্ন, বিয়ার দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে প্রেসিডেন্টের পদ শূন্য হওয়ার পরিস্থিতি হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না। তবে বিয়ার ক্ষমতাসীন ক্যামেরুন পিপলস ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টের প্রভাবের কারণে এমন উদ্যোগ সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম।
দেশের বাইরে থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন বিয়া। চলতি মাসের শুরুতে বড় ধরনের সামরিক রদবদলের অনুমোদন দিয়েছেন তিনি। তবে তার দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে প্রকাশ্যে প্রেসিডেন্টের জীবিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হচ্ছে সরকারকে।
বর্তমানে জার্মানিতে বসবাস করছেন ক্যামেরুনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কলিন্স মোলুয়া ইকোমে। এপ্রিলে ক্যামেরুন সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দেশটির বিভিন্ন সমস্যার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
ইকোমে বলেন, ‘ক্যামেরুনের সড়কগুলো অত্যন্ত খারাপ। এমনকি আমি একটি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনাও দেখেছি।’
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দুর্নীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সংকটের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পশ্চিম ক্যামেরুনের দশ্যাং বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসাধারণ ও আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক উইলসন তামফুহ জানান, প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব অর্পণ করলে দেশ পরিচালনা অব্যাহত রাখার মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে ক্যামেরুনে। তার ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের মহাসচিব এবং মন্ত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
তবে তামফুহর মতে, বড় প্রশ্ন হলো সরকার দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারছে কি না।
তিনি বলেন, ‘মানুষ চায় ইংরেজিভাষী অঞ্চলের সংকটের সমাধান হোক, জীবনযাত্রার মান উন্নত হোক, আরও ভালো সড়ক তৈরি হোক, ডিগ্রি নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো মানুষের সংখ্যা কমুক এবং আরও অনেক কিছু।’
ক্যামেরুনের ইংরেজিভাষী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলছে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত। এর পাশাপাশি দেশটির উত্তরে বোকো হারামের হামলা এবং তরুণদের মধ্যে গভীর অর্থনৈতিক হতাশাও ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য হয়ে থাকবে বড় চ্যালেঞ্জ।
স্বাস্থ্যসেবাও ক্যামেরুনের অন্যতম বড় সমস্যা। ইকোমে জানান, দেশটির বহু মানুষের জন্য মানসম্মত চিকিৎসাসেবা এখনো নাগালের বাইরে।
তিনি বলেন, ‘দেশটির মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছরের নিচে। তবে বিদেশে চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ থাকায় তার চেয়ে অনেক বেশি সময় বেঁচে আছেন বিয়া। দারিদ্র্যের কারণে সাধারণ ক্যামেরুনবাসী সেই চিকিৎসাসেবা পায় না।’
আফ্রিকার আরও কয়েকটি দেশের মতো ক্যামেরুনেও রাজনৈতিক অভিজাতদের বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অথচ নিজ দেশের সাধারণ মানুষের জন্য সরকারি সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে প্রশ্ন।
বিমের কাছে বিষয়টি আরও ব্যক্তিগত। তার প্রশ্ন, তিনি কি জীবদ্দশায় ক্যামেরুনের আরেকজন প্রেসিডেন্টকে দেখে যেতে পারবেন? কয়েক দশক ধরে পরিবর্তনের অপেক্ষায় থাকা বিমের আশঙ্কা, বিয়া হয়তো তার এবং তার মতো আরও অনেক সাধারণ মানুষের আগেই ক্ষমতা ছাড়বেন না।
বিম বলেন, ‘তাদের যখনই সর্দি-জ্বর হয়, তারা বিদেশে চলে যান এবং সেখানে চিকিৎসা পান। কিন্তু চিকিৎসার অভাবে অন্য ক্যামেরুনবাসীরা মারা যাচ্ছে।’











