স্বাধীনতা দিবসে বড় বার্তা মোদির
২০৪৭ সালের মধ্যেই পুরোপুরি আত্মনির্ভর হবে ভারত
- চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ মোদির
- উৎপাদন থেকে প্রযুক্তি, কৃষি থেকে প্রতিরক্ষা: উন্নয়নের সাত ক্ষেত্রকে ‘সপ্তধারা’ হিসেবে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
- ভারতীয় পণ্যকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠা
- এবং প্রতিরক্ষায় বিদেশনির্ভরতা কমানোর আহ্বান

স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ২ বছরের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন মোদি।
আর মাত্র দুই দশক; অর্থাৎ ২০৪৭ সালের মধ্যেই স্বনির্ভর হবে ভারত। ভারতের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে দিল্লির লালকেল্লা থেকে দেওয়া ভাষণে গতকাল সে বার্তাই দিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ভারতকে ‘বিকশিত’ এবং পুরোপুরি আত্মনির্ভর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে তুলে ধরলেন উন্নয়নের সাতটি প্রধান স্তম্ভের রূপরেখা। বার্তার কেন্দ্রে ছিল আত্মনির্ভরতা, যুবশক্তি, প্রযুক্তি, উৎপাদন, প্রতিরক্ষা এবং জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে গত চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত স্বাধীনতা দিবসের ভাষণও দিলেন তিনি— প্রায় ৭৮ মিনিট। ২০২৫ সালে তার ভাষণ ছিল ১০৩ মিনিট, ২০২৪ সালে ৯৮ এবং ২০২৩ সালে ৯০ মিনিট।
এদিন সকালে রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর সমাধিতে শ্রদ্ধা জানিয়ে লালকেল্লায় পৌঁছান মোদি। সকাল ৭টা ২৯ মিনিট নাগাদ সেখানে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর লালকেল্লার ঐতিহাসিক প্রাচীর থেকে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন প্রধানমন্ত্রী। পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে ১৭২১ ফিল্ড ব্যাটারির (সেরিমোনিয়াল) দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ১০৫ মিলিমিটার লাইট ফিল্ড গান থেকে ২১ বার তোপধ্বনি দেওয়া হয়। এ বছরের অনুষ্ঠানের বিশেষ আকর্ষণ ছিল, ‘বন্দে মাতরম্’-এর ১৫০ বছরপূর্তি। সকাল ৭টা ৩৭ মিনিট নাগাদ ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশিত হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ শুরু করেন।
বরাবরের মতো পোশাকেও এদিন বিশেষ নজর ছিল মোদির। লাল বান্ধানি ছাপের ঐতিহ্যবাহী পাগড়ির সঙ্গে গাঢ় বাদামি নেহরু জ্যাকেট পরেছিলেন তিনি। স্বাধীনতা দিবসে প্রতি বছরই আলাদা ধরনের ঐতিহ্যবাহী পাগড়ি বেছে নেওয়ার যে রীতি তিনি ২০১৪ সাল থেকে বজায় রেখেছেন, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
আত্মনির্ভর ভারতের প্রসঙ্গে মোদির স্পষ্ট বার্তা, অন্য দেশের ওপর নির্ভর করে ভারতের সক্ষমতা তৈরি করা যাবে না। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘ভোকাল ফর লোকাল’-কে মানুষের ভাবনার অংশ করে দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তিকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিকস, রেল কোচ ও মোবাইল ফোন উৎপাদনে গত ১২ বছরের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরেন। আগামী পাঁচ-সাত বছরে এমন কিছু অর্জনের লক্ষ্য দেন, যা গত পাঁচ-সাত দশকেও সম্ভব হয়নি। এই আত্মনির্ভরতার বৃহত্তর পরিকল্পনার নাম দেন ‘শক্তি কি সপ্তধারা’। সাতটি ধারা হলো— উৎপাদন, কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন, গতিশক্তি, প্রতিরক্ষা শক্তি, সবুজ ও নীল অর্থনীতি এবং ভারতের সফট পাওয়ার। উৎপাদনে কম খরচে উন্নত মানের বেশি পণ্য, কৃষিপণ্যকে প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্ববাজারে পৌঁছে দেওয়া, ডেটা সেন্টার রোবোটিকস-৬জির মতো প্রযুক্তিতে দেশীয় সক্ষমতা, উন্নত যোগাযোগ পরিকাঠামো এবং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ড্রোন ও কাউন্টার ড্রোন প্রযুক্তির ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। সবুজ শক্তি, গ্রিন হাইড্রোজেন, সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি এবং যোগ, হস্তশিল্প, সিনেমা, অ্যানিমেশন, গেমিং ও পর্যটনের মতো সফট পাওয়ারকেও উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
যুবসমাজকে এই অভিযানের মূল শক্তি হিসেবে তুলে ধরে আগামী এক বছরে এক কোটি যুবক-যুবতীকে এআই প্রশিক্ষণ দেওয়ার ঘোষণা করেন মোদি। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বিনামূল্যে কোচিংয়ের কথাও বললেন। তার বক্তব্য, বিকশিত ভারতের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হবে দেশের তরুণ প্রজন্ম। একই সঙ্গে ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
নারী সংরক্ষণ নিয়েও বিরোধীদের সহযোগিতা চেয়ে মোদি বলেছেন, বিধানসভা ও লোকসভায় নারীদের আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত না হলে বিকশিত ভারত পূর্ণতা পাবে না। অন্যদিকে কংগ্রেস সাংসদ জেবি ম্যাথার অভিযোগ করেন, সরকার সত্যিই আন্তরিক হলে এতদিনে নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর হয়ে যেত। এর আড়ালে ডিলিমিটেশনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। ভাষণের রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশ ছিল ‘দিমাগি নকশাল’-এর প্রসঙ্গ। মোদির দাবি, সশস্ত্র নকশালবাদ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও আদর্শগত নকশাল মানসিকতার মানুষ এখনো হিংসা ও অরাজকতার সুযোগ খুঁজছে। সেসব দিমাগি নকশালকে চিহ্নিত করে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর তীব্র সমালোচনা করেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ, পবন খেরা ও আপ প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। অন্যদিকে লালকেল্লার অনুষ্ঠানে প্রায় ৫ হাজার বিশেষ অতিথি উপস্থিত ছিলেন। যুব, কৃষি, বিজ্ঞান ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বের অধিকারীরা তাদের মধ্যে ছিলেন। সব মিলিয়ে ১৫ আগস্টের ৭৮ মিনিটের ভাষণে মোদি স্পষ্ট করে দিলেন, ২০৪৭ সালের ‘বিকশিত ভারত’-এর ভিত্তি হবে আত্মনির্ভরতা। আর সে লক্ষ্য পূরণে যুবশক্তি, ‘সপ্তধারা’, দেশীয় উৎপাদন ও প্রযুক্তিই হবে তার নির্ধারিত প্রধান পথ।






