হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন
পাঁচ বছরে আরও অন্ধকার আফগানিস্তান
- তালেবান শাসনে বহুমুখী সংকট

মানবাধিকার সংকটের পাশাপাশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে আফগানিস্তানের মানবিক পরিস্থিতিও।
পাঁচ বছর আগে কাবুলের দখল বদলে দিয়েছিল আফগানিস্তানের রাজনৈতিক পটভূমি। কিন্তু সেই পরিবর্তনের পর যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তা আজও দেশটির মানুষের কাছে স্বস্তির নয়। বরং সময়ের সঙ্গে আরও কঠোর হয়েছে নিয়ন্ত্রণ। সংকুচিত হয়েছে নাগরিক অধিকার। বিশেষ করে নারী ও কন্যাশিশুদের জীবনে নেমে এসেছে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা। ১৫ আগস্ট তালেবানের আফগানিস্তান দখলের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে, ৩ আগস্ট নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এমনই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। তালেবান শাসনে দেশটির গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিটি টু প্রটেস্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)।
সংস্থাটির দাবি, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের পর থেকে নারী ও মেয়েদের স্বাভাবিক কাজ, চলাফেরা এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের অধিকার ক্রমেই সংকুচিত করেছে তালেবান। সবচেয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে শিক্ষার ক্ষেত্রে। আফগানিস্তান এখনো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের ষষ্ঠ শ্রেণির পর পড়াশোনা করার কোনোরকম সুযোগ নেই। তালেবানের নৈতিকতা পুলিশ কর্মক্ষেত্র ও জনসমাগমের জায়গায় নজরদারি চালাচ্ছে এবং পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নারীদের আটক করার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটির বক্তব্য, চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি নতুন ফৌজদারি কার্যবিধি জারি করেছে তালেবান। সেখানে হানাফি মতাদর্শকে একমাত্র স্বীকৃত মুসলিম ব্যাখ্যা হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি অন্য ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর প্রতি বৈষম্যের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন আইন ও নীতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়েছে বলেও অভিযোগ। সাংবাদিক, নারী অধিকারকর্মী, সমাজকর্মী, শিক্ষাবিদ, শিল্পী এবং সরকারের সমালোচকদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
মানবাধিকার সংকটের পাশাপাশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে দেশের মানবিক পরিস্থিতিও। এইচআরডব্লিউর হিসাবে ২০২৬ সালেই আফগানিস্তানের ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষ দেশটির প্রায় ৪০ শতাংশ জনসংখ্যা তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারেন। আন্তর্জাতিক সাহায্য কমে যাওয়ায় মানবিক সংগঠনগুলোকে তাদের কর্মসূচি ও পরিষেবাও কমাতে হয়েছে। তালেবানের নারী ত্রাণকর্মীদের ওপর বিধিনিষেধও সাধারণ মানুষের কাছে মানবিক সাহায্য পৌঁছানোর পথে বাধা তৈরি করছে বলে অভিযোগ।
দেশের বাইরে থেকেও চাপ বাড়ছে। ইরান ও পাকিস্তান থেকে বিপুল আফগানকে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে জার্মানিও আফগানদের প্রত্যাবাসন শুরু করেছে। সংস্থাটির মতে, নির্যাতন, নির্বিচার আটক বা অন্য গুরুতর ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে— এমন কোনো আফগানকে জোর করে দেশে ফেরানো উচিত নয়।
এরই মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতেও প্রাণহানি ঘটেছে। ২০২৬ সালের ১৬ মার্চ কাবুলের ওমিদ ড্রাগ রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টারে পাকিস্তানি বিমান হামলায় অন্তত ২৬৯ জন বেসামরিক নিহত এবং ১২২ জনের বেশি আহত হয়, জাতিসংঘের তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মহলকে শুধু উদ্বেগ প্রকাশ না করে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার পরিষদ আফগানিস্তানে অতীত ও বর্তমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে একটি স্বাধীন ব্যবস্থা তৈরির প্রস্তাব অনুমোদন করেছিল। সেই ব্যবস্থাকে কার্যকর করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তে সহযোগিতা, ঝুঁকিতে থাকা আফগানদের সুরক্ষা এবং জোরপূর্বক প্রত্যাবাসন বন্ধের দাবি জানিয়েছে এইচআরডব্লিউর আফগানিস্তান গবেষক ফেরেশতা আব্বাসি।
পাঁচ বছরে স্তব্ধ আফগানিস্তানের কণ্ঠস্বর:
কাবুল দখলের পাঁচ বছর পূর্তির প্রাক্কালে আফগানিস্তানের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল কমিটি টু প্রটেস্ট জার্নালিস্ট (সিপিজে)। গত শুক্রবার নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়ন অবিলম্বে বন্ধ করতে তালেবানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। সিপিজের বক্তব্য, গত পাঁচ বছরে শুধু সাংবাদিকদের ওপর বিচ্ছিন্নভাবে চাপ সৃষ্টিই নয় বরং স্বাধীন তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে একটি প্রচারব্যবস্থা গড়ে তুলেছে তালেবান।
২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের পরপরই সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ শুরু হয় বলে জানিয়েছে সিপিজে। সরকারি সম্প্রচার মাধ্যমে নারী সাংবাদিকদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া, বিক্ষোভের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের মারধর এবং পরবর্তী সময়ে নির্বিচারে আটক ও কারাবাসকে সংবাদ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। সিপিজের নথিভুক্ত প্রথম দিকের ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে হেরাটের রেডিও নওরুজের সাংবাদিক ও প্রযোজক খালিদ কাদেরির মামলা। ২০২২ সালে তালেবান তার সাংবাদিকতার কাজের জন্য তাকে সাজা দেয়।
সিপিজের আফগানিস্তান-পাকিস্তান প্রতিনিধি ওয়ালিউল্লাহ রহমানির কথায়, তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পাঁচ বছরে আফগানিস্তান সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠিন দেশে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিকদের নজরদারি, আটক, মারধর, সেন্সরশিপ এবং নির্বাসনে ঠেলে দেওয়ার পাশাপাশি নারী সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে বৈষম্য আরও তীব্র হয়েছে। ইন্টারনেট ও মোবাইল যোগাযোগে বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও সংকটজনক করে তুলেছে।
সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছেন নারী সাংবাদিকরা। হেলমান্দে রেডিও ও টেলিভিশনে নারীদের কণ্ঠ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা এবং টেলিভিশনে উপস্থিতির সময় মুখ ঢাকার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তালেবান গোয়েন্দারা নারী পরিচালিত রেডিও বেগমে অভিযান চালিয়ে সেটির সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।






