যুদ্ধটা তাদের নয়, তবু মরতে যাচ্ছেন ইউক্রেনের মাটিতে

সংগৃহীত ছবি
ইয়েমেনের যুদ্ধবিধ্বস্ত শহরগুলোয় বড় হওয়া অনেক তরুণের কাছে বন্দুক নতুন কিছু নয়। কেউ লড়েছেন হুতি আন্দোলনের হয়ে। কেউ ইয়েমেন সরকারের পক্ষে, আবার কেউ সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত মিলিশিয়াদের সঙ্গে। বছরের পর বছর যুদ্ধ, দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটতে কাটতে তাদের জীবনে মৃত্যুভয়ও যেন একসময় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কিন্তু এখন সেই তরুণদের অনেকেই হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের আরেকটি যুদ্ধে পাড়ি জমাচ্ছেন।
গন্তব্য রাশিয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্র ইউক্রেন। আর তাদের টানছে মোটা অঙ্কের টাকা, মাসিক বেতন আর রুশ নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতি।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাবিলসহ প্রায় ১০ জন সৈন্য হঠাৎ রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনে হয় তাদের আগে থেকেই সেখানে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগে ছিল
ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে রিপাবলিকান গার্ড বাহিনীর হয়ে লড়তেন তরুণ আহমেদ নাবিল। তার সহযোদ্ধা ফাওজি পরে বলেছিলেন, ‘নাবিল মাসে প্রায় ২৬০ ডলার বেতন পেতেন, যা ইয়েমেনে একজন অভিজ্ঞ হিসাবরক্ষকের আয়ের কাছাকাছি। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের বাস্তবতায় সেই অর্থেও সংসার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছিল। এরই মধ্যে একদিন খবর আসে, রাশিয়ায় গেলে অনেক বেশি টাকা পাওয়া যাবে।’
ফাওজি আরও বলছিলেন, ‘২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে নাবিলসহ প্রায় ১০ জন সৈন্য হঠাৎ রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মনে হয় তাদের আগে থেকেই সেখানে থাকা কারও সঙ্গে যোগাযোগে ছিল।’
সহযোদ্ধারা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ইউক্রেনের যুদ্ধ ভয়ংকর। কিন্তু যারা যাচ্ছিলেন, তারা আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে টিকে থাকা মানুষ হিসেবে পৃথিবীর যেকোনো ফ্রন্টলাইনে তারা টিকে যেতে পারবেন।’
রাশিয়ার দালালরা তাদের যে প্রস্তাব দিচ্ছিল, সেটি ইয়েমেনের মতো দরিদ্র দেশের তরুণদের কাছে প্রায় অবিশ্বাস্য। শুরুতেই ১৫ হাজার ডলার, মাসে ৫ হাজার ডলার বেতন, সঙ্গে রুশ নাগরিকত্বের সম্ভাবনা।
ফাওজি স্বীকার করেন, ‘একসময় তিনিও ভেবেছিলেন ইউক্রেন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু পরে দেখলাম, আমার প্রায় কোনো সহযোদ্ধাই আর ফিরে আসেনি। তখন বুঝলাম, এই টাকার মূল্য দিতে হবে নিজের রক্ত দিয়ে।’
একবার যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গেলে এক বছরের চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফিরে আসার সুযোগ নেই। অনেকে লিখেছেন, ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও তাদের কাছে এত ভয়াবহ মনে হয়নি
২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা চালানোর পর থেকেই খবর আসছিল, ইয়েমেনি তরুণদের নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখানে নেওয়া হচ্ছে। শুরুতে অনেককে বলা হয়েছিল, তারা রেস্তোরাঁ বা খামারে কাজ করবেন। কিন্তু পরে গিয়ে দেখা যায়, তাদের পাঠানো হচ্ছে সামরিক ক্যাম্পে।
সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘প্রথম দিকে অনেকেই প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু এখন যারা যাচ্ছেন, তাদের বেশিরভাগই জানের যে তারা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে যাচ্ছেন।’
তার মতে, ইয়েমেনের ভেঙে পড়া অর্থনীতি এবং সেনাবাহিনীতে অনিয়মিত বেতন তরুণদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করছে। কিন্তু যুদ্ধের বাস্তবতা কল্পনার চেয়েও ভয়ংকর।
গত এক বছরে ইউক্রেনের ফ্রন্টলাইন থেকে বেশ কয়েকজন ইয়েমেনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও পোস্ট করেছেন। সেখানে তারা বলছেন, ‘একবার যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে গেলে এক বছরের চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফিরে আসার সুযোগ নেই। অনেকে লিখেছেন, ইয়েমেনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও তাদের কাছে এত ভয়াবহ মনে হয়নি।’
কেউ কেউ অন্যদের সতর্কও করছেন, ‘এখানে এসো না। আবার এমন অনেক অ্যাকাউন্টও রয়েছে, যেগুলো মাসের পর মাস নিস্তব্ধ। পরিবারগুলো শুধু অনুমান করতে পারে— হয়তো তারা আর বেঁচে নেই।’
আমি তাওহিদের স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পাই। তখনই বুঝে যাই, আমার ছেলে আর নেই। এরপর কী হয়েছিল, সেটিও ঠিক মনে নেই তার। হয়তো আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি পুরো পরিবার আমাকে ঘিরে আছে। শুধু তাওহিদ নেই
ইয়েমেনের এক মা উম্মে তাওহিদ। তিনি এখনো বিশ্বাস করতে পারেন না, তার ছেলে আর ফিরবে না। তার ছেলে তাওহিদ আগে সৌদি সীমান্তে লড়তেন। পরিবার চালানোর জন্যই তিনি যুদ্ধে গিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েক মাস আগে পরিবার জানতে পারে, তিনি রাশিয়ায় চলে গেছেন।
উম্মে তাওহিদ বলেছিলেন, ‘আমি শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। তার স্ত্রীকে বলেছিলাম, তাকে ফিরতে বলো। কিন্তু তারা বললেন, সেটা সম্ভব নয়।’
তারপর একদিন তিনি শুনলেন কান্নার শব্দ। ‘আমি তাওহিদের স্ত্রীর চিৎকার শুনতে পাই। তখনই বুঝে যাই, আমার ছেলে আর নেই। এরপর কী হয়েছিল, সেটিও ঠিক মনে নেই তার। হয়তো আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। জ্ঞান ফেরার পর দেখি পুরো পরিবার আমাকে ঘিরে আছে। শুধু তাওহিদ নেই।’
তিন সন্তানের বাবা তাওহিদের মৃতদেহটিও শেষবার দেখতে পারেননি তার মা।
কাঁদতে কাঁদতে তিনি অন্য পরিবারগুলোর উদ্দেশে বলেছেন, ‘স্বামী বা সন্তানদের কোনো যুদ্ধে পাঠাবেন না— ইয়েমেনে হোক বা ইউক্রেনে। এই কষ্ট কখনো ভোলার নয়।’
৩৭ বছর বয়সী মাহমুদ আল-সাবরি পরিবারের কাছে বলেছিলেন, ‘তিনি আফ্রিকার ছোট দেশ জিবুতিতে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করতে যাচ্ছেন। সত্যিই তিনি জিবুতিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পরে পরিবার জানতে পারে, সেখান থেকে তিনি রাশিয়ায় চলে গেছেন।’
কাউকে জোর করে যুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষ্য, ‘স্বেচ্ছাসেবকরা রুশ আইনের পূর্ণ অনুসরণ করেই সেখানে যাচ্ছেন
তার বাবা মুস্তাফা বলেছেন, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ নয়। আমার ছেলে কেন সেখানে গেল, আমি জানি না।’
পরিবার সর্বশেষ মাহমুদের সঙ্গে কথা বলেছিল এপ্রিল মাসে। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, তিনি একটি বনের মধ্যে অন্য যোদ্ধাদের সঙ্গে আছেন। তারপর থেকে আর কোনো খবর নেই।
‘সে বেঁচে আছে, মারা গেছে নাকি বন্দি, আমরা কিছুই জানি না’—বলেছিলেন তার বাবা।
এদিকে সের্গেই ল্যাভরভ মার্চ মাসে স্বীকার করেছিলেন, বিদেশিরা ইউক্রেনে লড়াই করছে। তার দাবি, কাউকে জোর করে যুদ্ধে নেওয়া হচ্ছে না। তার ভাষ্য, ‘স্বেচ্ছাসেবকরা রুশ আইনের পূর্ণ অনুসরণ করেই সেখানে যাচ্ছেন।’
কিন্তু ইয়েমেনের ভাঙাচোরা ঘরগুলোয় বসে থাকা মায়েরা জানেন, এই যুদ্ধের গল্প শুধু রাজনীতি নয়। এটি দারিদ্র্যের গল্প। বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। আর এমন তরুণদের গল্প, যারা নিজের দেশের যুদ্ধ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেকটি যুদ্ধের অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।







