প্রচার যুদ্ধ
ব্যালন ডি'অর নাকি নির্বাচনী প্রচারণা!

ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাকর ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি'অরের মঞ্চ এখন যেন কোনো জাতীয় নির্বাচনের রণাঙ্গন! মাঠে গোলের লড়াই ছাপিয়ে মাঠের বাইরে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে যেভাবে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার ইঁদুরদৌড় শুরু হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে ব্যালন ডি'অর নয়, লড়াইটি চলছে কোনো ক্লাবের বা দেশের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য। আর এই প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দুই তরুণ তুর্কি—কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামাল।
অতীতে ব্যালন ডি'অর বিজয়ী নির্ধারিত হতো মূলত সাংবাদিক, কোচ ও খেলোয়াড়দের ভোটে। সংক্ষিপ্ত তালিকায় থাকা প্রার্থীরা বেশ শালীনতা বজায় রাখতেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই চিত্র পাল্টে গেছে পুরোপুরি। মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়েও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা, একের পর এক সাক্ষাৎকার এবং মুখের কথায় ভোটারদের মন জয় করার এক অভিনব লড়াই শুরু হয়েছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ৪৩ গোল এবং ফ্রান্সের জার্সিতে বিশ্বকাপ মাতিয়ে তিন তিনটি গোল্ডেন বুট জিতেছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই ফরাসি তারকা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে নিজেকেই সেরা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘গত মৌসুমে আমার চেয়ে ভালো কোনো খেলোয়াড় ছিল না।’ এমনকি নিজেকে ‘একমাত্র নির্বাচিত’ বলেও দাবি করেছেন তিনি। রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরোয়ার্ডের মা ফেইজা এবং আইনি পরামর্শকদের নিয়ে গড়া শক্তিশালী দল তার ভাবমূর্তির উন্নয়ন ও প্রচারের পেছনে কাজ করে যাচ্ছে।
পিছিয়ে নেই বার্সেলোনার স্প্যানিশ সেনসেশন লামিনে ইয়ামালও। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইউরো ও বিশ্বকাপ জয়ের ট্রফি ক্যাবিনেটে থাকা এই তরুণ স্টার এজেন্ট হোর্হে মেন্দেস ও প্রায় দশজনের একটি বিশাল পিআর টিম নিয়ে নেমেছেন ময়দানে। খোলামেলা সাক্ষাৎকারে ইয়ামাল বলেই দিয়েছেন, ‘আমি মনে করি, বিশ্বে এই মুহূর্তে সেরা দুই খেলোয়াড় হলো আমি এবং এমবাপ্পে। আমি যা জিতেছে, তাতে এই বছর আমারই পুরস্কারটি পাওয়া উচিত।’ ফরাসি সাংবাদিক ওয়ালিদ আচারচুরের মতে, ইয়ামাল সুকৌশলে এই লড়াইকে কেবল নিজের এবং এমবাপ্পের দ্বৈরথে সীমাবদ্ধ করতে চাইছেন, যাতে হ্যারি কেইন বা উসমান দেম্বেলের মতো অন্য দাবিদাররা আড়ালে চলে যান।
এই দুই তারকার আক্রমণাত্মক প্রচারণার বিপরীতে হ্যারি কেইন ও উসমান দেম্বেলে অবশ্য বেশ সংযত ও কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছেন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৭৩ গোলের অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়া কেইন নিজের গোলের পরিসংখ্যানের ওপর ভরসা রাখছেন। গতবারের বিজয়ী দেম্বেলে পিএসজির জার্সিতে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের সুবাদে বেশ শান্ত মেজাজে আছেন। তবে এমবাপ্পে ও দেম্বেলের পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং ব্যালন ডি'অর জেতার এই উন্মত্ততা প্রমাণ করে যে ফুটবলারদের কাছে এই ট্রফির বাণিজ্যিক মূল্য ও গ্ল্যামার এখন আকাশছোঁয়া।
ফুটবল বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সতর্ক করে বলছেন, অতিরিক্ত প্রচারণা বা ভোটারদের দৃষ্টি কাড়ার এই মরিয়া চেষ্টা অনেক সময় বুমেরাং হতে পারে। ব্যালন ডি'অরের সাবেক পরিচালক পাসকাল ফেরের ভাষায়, ভোটাররা অনেক সময় অতিরিক্ত প্রচারণায় বিরক্ত হন। শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি'অরের সোনার বল কার হাতে ওঠে, সেটাই এখন দেখার বিষয়!





