বিশ্বকাপ পৃথিবীর মানুষের উত্তরাধিকার

সংগৃহীত ছবি
আফসোস হচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবলের কথা ভেবে। জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর পরিকল্পনাটি অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ফুটবল উন্নয়নে দারুণ একটা সুযোগ পেত। দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটে থাকা বাফুফের জন্য ফিফার প্রতিশ্রুত প্রায় ৪ কোটি ডলার অর্থাৎ ৪৯২ কোটি টাকা হতে পারত বিশাল এক সহায়। এ দিয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবল, বয়সভিত্তিক দল, নারী ফুটবল এবং কোচিংব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের পথে হাঁটতে পারত।
যদিও ফিফার অর্থে অনর্থও ঘটেছে বাফুফেতে। ফিফার অনুদানের টাকার অপব্যবহার ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল বাফুফের বিরুদ্ধে। এমনকি আর্থিক অনিয়মের কারণে বাফুফের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদককে নিষিদ্ধও করেছিল ফিফা। তাই বলি, এই পরিকল্পনা অনুমোদন হয়নি, ভালোই হয়েছে। শুধু বাফুফের জন্য নয়, পুরো পৃথিবীর জন্যই এটি বড় সুখবর।
ফুটবল শুধুই একটি খেলা নয়, এটি স্মৃতি, আবেগ, ইতিহাস এবং কোটি কোটি মানুষের আনন্দ-বেদনারও স্মারক। বিশ্বকাপের একটি গোল যেমন একটি জাতিকে আনন্দে কাঁদাতে পারে, তেমনি একটি হার যন্ত্রণা হয়ে বিঁধে থাকে অনেক দিন। তাই বিশ্বকাপ কখনো গুটিকয়েক মানুষের বাণিজ্যিক সম্পদ হতে পারে না। এজন্যই ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক সময়ের পরিকল্পনা বিশ্ব ফুটবলে এত বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
পরিকল্পনাটা কী ছিল
ইনফান্তিনোর পরিকল্পনা ছিল ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এএফই) নামের নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা। এই প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিশ্বকাপ, নারী বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ ফিফার সবচেয়ে মূল্যবান বাণিজ্যিক সম্পদ যেমন সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট, লাইসেন্সিং একসঙ্গে করা হতো। এরপর এই কোম্পানির প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার তোলার পরিকল্পনা। ফিফা প্রেসিডেন্টের কথা অনুযায়ী, এটা খুব সামান্য বিনিয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণ থাকবে ফিফার হাতেই। আর প্রাপ্ত অর্থ ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হবে।
তাতে লাভ ২১১টি সদস্য দেশের। এটা অনুমোদিত হলে আগামী জানুয়ারিতে এককালীন ২ কোটি ডলার পেত প্রতিটি সদস্য দেশ। এরপর ২০২৭-৩০ চক্রে আরও ২ কোটি ডলার। এই ৪৯২ কোটি টাকার পরও ছিল বাড়তি অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কাগজে-কলমে এটি ছিল স্বপ্নের মতো এক প্রস্তাব।
সমালোচনার ঝড়
সমস্যা হলো, এত লোভনীয় প্রস্তাব শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করে ইউরোপ মানে উয়েফা। তাদের ৫৫ দেশ হুমকি দেয় বিশ্বকাপসহ ফিফার সব টুর্নামেন্ট বর্জনের। সুর মেলায় কনকাকাফ ও এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি)। তারা বর্জনের হুমকি না দিলেও ইনফান্তিনোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে সোচ্চার। সংকট আরও গভীর হয় ফিফার ভেতরের অনেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধাচরণে। ফিফা সভাপতির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেছেন এটাকে ‘ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য খারাপ পরিকল্পনা’ আখ্যা দিয়ে। ফিফা গভর্নিং বডির চিফ অপারেটিং অফিসার কেভিন লামোর প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন তীব্র ভাষায়, ‘এটা একজনের মস্তিষ্কপ্রসূত চিন্তা। ফিফা প্রশাসনকেও পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।’
পরিকল্পনাটা মোটেও স্বচ্ছ ছিল না। তাই বিভিন্ন দেশ ও ওই ফিফা কর্মকর্তাদের শঙ্কা— এটি ফুটবলের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দেবে।
সম্ভাব্য ক্ষতি
একটা প্রশ্ন উঠতে পারে, ইনফান্তিনো যেমন আর্থিক উন্নয়নের অঙ্ক দেখিয়েছেন, বিপরীতে সমালোচকরা কেন কোনো আর্থিক ক্ষতি দেখাতে পারছেন না? সেটা ঠিক, সব ক্ষতির তো অর্থমূল্য হয় না। একটি পুরনো বটগাছ কেটে ফেললে তার কাঠের দাম নির্ধারণ করা যায়, কিন্তু তার ছায়ার মূল্য নির্ধারণ করা যায় না।
আরও সহজ করে বললে, ফুটবল দেখে তখন আর আগের মতো শিহরিত হবেন না, মজা পাবেন না। আপনার প্রিয় ফুটবলই হতে পারে ডব্লিউডব্লিউএফের একটি সংস্করণ। যেখানে সবই মেকি, সবই সাজানো। কারণ বেসরকারি বিনোয়াগকারীরা চাইতে পারে ৯০ মিনিটের খেলার মধ্যে ৪০ মিনিটের ব্যান্ড শো রাখতে হবে। বিজ্ঞাপন বিরতি দিতে হবে ১৫ মিনিট পরপর। জেতাতে হবে বড় দলকে, যাদের সঙ্গে নামিদামি ব্র্যান্ড আছে। বেসরকারি কোম্পানি যখন বিশ্বকাপের স্টেকহোল্ডার তখন বলতেই পারে এবং ফিফার না শুনে উপায় কী!
ফিফা হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে বলবে, ‘নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই।’ কিন্তু একটি কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের বিনিয়োগের মুনাফা বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়, তখন লাভের হিসাব ধীরে ধীরে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। করপোরেট দুনিয়ার একটি অমোঘ সত্য হলো— যেখানে পুঁজি যায়, সঙ্গে যায় মুনাফার দাবিও।
তখন বিশ্বকাপে আর ফুটবলের নিখাদ আনন্দ থাকবে না। সেটি হয়ে ওঠে একটি বিনোদন প্যাকেজ। যেখানে নাটক, আলো, বিজ্ঞাপন থাকবে, থাকবে না শুধু ফুটবলের মুহূর্তের সৌন্দর্য ও রোমাঞ্চ।
ফুটবল পৃথিবীর সম্পদ
পৃথিবীতে কিছু প্রতিষ্ঠান আছে, যেগুলোকে বাজারের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। যেমন ধরুন ফায়ার সার্ভিসকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দিলেন, তখন আপনার বাড়িতে আগুন লাগলেও তারা আসবে না। বলবে আগে টাকা জমা করুন, তারপর আসছি আগুন নেভাতে।
তেমনি পুলিশ বিভাগকেও মুনাফাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারবেন না। তখন তারা উচ্চবিত্তকে সেবা দেবে। আপনার টাকা নেই, আপনার বিপদে-আপদেও পাবেন না পুলিশকে। একইভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পুরোপুরি বাজারের হাতে গেলে টিকা, জরুরি চিকিৎসা কিংবা দরিদ্র মানুষের জীবন বলতে কিছুই থাকবে না। রাষ্ট্র বিনামূল্যে টিকার ব্যবস্থা করে বলেই আমরা নির্ভার থাকতে পারি। সরকার হামের টিকা সময়মতো ব্যবস্থা করেনি বলেই কতগুলো বাচ্চার জীবন গেল। এজন্য সরকারের সমালোচনা হয়েছিল। কারণ এটা তাদের দায়িত্ব। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্র কিছু খাতকে জনস্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
ফুটবল রাষ্ট্রীয় নয়, বরং বৈশ্বিক বিনোদনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপকরণ। এটা কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি নয়। পৃথিবীর মানুষের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সম্পদ।
এই সত্যটি ইনফান্তিনো বুঝেছেন কি না, কে জানে। তবে নানামুখী সমালোচনার কারণে বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হয়েছে ফিফা সভাপতিকে। নিজেই স্বীকার করেছেন, তার প্রস্তাব ফুটবল পরিবারে বিভাজন সৃষ্টি করেছে, আর সেই বিভাজন প্রকল্পটির উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে দিয়েছে।
পরিশেষে
ইনফান্তিনো পুরো বিশ্বকে টাকার লোভ দেখিয়ে বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রি করতে চেয়েছিলেন। বিশ্বকাপ এমন একটি সম্পদ, যার অংশ বিক্রি করা যায় না। এটা পৃথিবীর মানুষের উত্তরাধিকার, যা শুধু পরবর্তী প্রজন্মের হাতে অক্ষত অবস্থায় তুলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের।






