কেন বিশ্ব জুড়ে জনপ্রিয় কে-পপ, ব্যর্থ হলো সি-পপ

কে পপ বিটিএস বিটিএস
দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় সংগীতধারা কে-পপ গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব জুড়ে বড় ধরনের সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করেছে। অন্যদিকে, চীনের বিশাল জনসংখ্যা, বড় সংগীতবাজার এবং বিপুল প্রবাসী জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও চীনা পপ বা সি-পপ এখনো কে-পপের মতো বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি। কেন এমন হলো?
টাইমের বিশ্লেষণধর্মী এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে বাজারের আকার, বিদেশি দর্শকের রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার এবং শিল্পী-ভক্তদের সম্পর্কের ওপর নিয়ন্ত্রণসহ বেশ কিছু কারণ।
সম্প্রতি লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফি স্টেডিয়ামে বিটিএসের ‘আরিরাং’ বিশ্ব সফরের উত্তর আমেরিকা পর্বের শেষ কনসার্টে হাজারো দর্শক দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকা হাতে নিয়ে কোরীয় ঐতিহ্যবাহী সুরে গলা মিলিয়েছেন। চার রাতের ওই আয়োজন ছিল ৩১টি কনসার্টের সফরের শেষ পর্ব। ব্যান্ডটির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, পুরো সফরে দর্শকসংখ্যা ছিল প্রায় ১৯ লাখ ২০ হাজার।
এ বছর কে-পপের সাফল্য আরও কয়েকটি ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। ‘কে-পপ ডেমন হান্টার্স’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের গান ‘গোল্ডেন’ গ্র্যামি পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি অস্কারেও পরিবেশিত হয়েছে এবং অস্কারে সেরা মৌলিক গানের পুরস্কারও পেয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য এসব সাফল্য শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; বরং ‘সফট পাওয়ার’-এরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বিশ্ব জুড়ে কোরীয় সংস্কৃতির জনপ্রিয়তা দেশটির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়তা করছে।
অন্যদিকে চীন দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ কোরিয়ার এই সাংস্কৃতিক সাফল্য অনুসরণ করার চেষ্টা করছে। ২০১৪ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবশালী নেতা ওয়াং ছিশান কোরীয় সংস্কৃতির আন্তর্জাতিক বিস্তার নিয়ে প্রকাশ্যে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক শিল্পের আন্তর্জাতিক বিপণন নিয়েও সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তবে চেষ্টা করেও চীন এখন পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কে-পপের সমতুল্য কোনো সংগীতশিল্পী বা সংগীতশিল্পী গোষ্ঠী তৈরি করতে পারেনি।
এর একটি বড় কারণ হতে পারে চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অ্যান্থনি ফাংয়ের মতে, চীনের ১০টি শহরে একটি কনসার্ট আয়োজন করলেই যে পরিমাণ দর্শক পাওয়া যায়, তা অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব জুড়ে সফরের সমান হতে পারে।
অর্থাৎ চীনা শিল্পীদের জন্য দেশের বাজারেই বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে। ফলে বিদেশি দর্শক খোঁজার জন্য বছরের পর বছর সময় ও অর্থ বিনিয়োগ করার বাণিজ্যিক প্রণোদনা তুলনামূলকভাবে কম।
অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় দেশটির বিনোদন প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু থেকেই বিদেশি দর্শক খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করেছে। তারা শিল্পীদের দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ দিয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে শিল্পী নিয়োগ করেছে এবং বিদেশি গীতিকার ও কোরিওগ্রাফারদের সঙ্গে কাজ করেছে।
ফলে কে-পপের অনেক গানের ভাষা কোরিয়ান হলেও এর সুর, নাচ, পরিবেশনা ও উপস্থাপন আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হয়েছে। দর্শককে গানটির প্রতিটি শব্দ বুঝতে না পারলেও নাচ বা পরিবেশনার মাধ্যমে আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়েছে।
ইউটিউবও কে-পপের বিশ্বব্যাপী বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় টেলিভিশন বা রেডিওর মাধ্যমে কোনো গান বিদেশে পৌঁছানোর অপেক্ষা করতে হয়নি। ভক্তরাই গান ও পারফরম্যান্সের ভিডিও একে অন্যের সঙ্গে শেয়ার করেছেন এবং নিজেদের ভিডিও তৈরি করেছেন।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে সাইয়ের ‘গ্যাংনাম স্টাইল’ ইউটিউবে এক বিলিয়ন ভিউ অতিক্রম করার সময় ইউটিউব জানিয়েছিল, প্রায় ৭৫টি দেশে গানটির অন্তত ১০ লাখ করে ভিউ হয়েছিল।
অন্যদিকে চীনা শিল্পীদের আন্তর্জাতিকভাবে একই ধরনের বিস্তার ঘটানো তুলনামূলক কঠিন। ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামের মতো জনপ্রিয় আন্তর্জাতিক সামাজিক মাধ্যম চীনে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় চীনা শিল্পীদের নিজ দেশের ভক্তদের সঙ্গে বিদেশি দর্শকদের সংযোগ তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
চীনা কোনো গান দেশটির নিজস্ব প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় হলেও সেটি মেক্সিকো বা ব্রাজিলের মতো দেশের সম্ভাব্য দর্শকের কাছে পৌঁছাতে অতিরিক্ত বাধার মুখে পড়ে।
এর সঙ্গে রয়েছে চীনের বিনোদন খাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ। ২০২১ সালে চীনের ইন্টারনেট কর্তৃপক্ষ বিনোদন তারকাদের অনলাইন র্যাঙ্কিং বন্ধ করে এবং ফ্যান অ্যাকাউন্টগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ায়। একই সময়ে আইডল তৈরির টেলিভিশন অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ করা হয় এবং শিল্পীদের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণের ওপর জোর দেওয়া হয়।
এসব পদক্ষেপের কিছু অংশ অতিরিক্ত ভক্ত-ব্যয় বা তরুণদের ওপর বিনোদনশিল্পের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ থেকে নেওয়া হলেও, এর ফলে শিল্পী ও ভক্তদের সম্পর্কের ওপরও নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।
টাইম- এর নিবন্ধে রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের ‘সফট পাওয়ার’ ধারণার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, জনপ্রিয় বিনোদনের মধ্যে ব্যক্তিস্বাধীনতা, ভোক্তার পছন্দ এবং অন্যান্য সামাজিক মূল্যবোধের সূক্ষ্ম বার্তা থাকতে পারে, যা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করে।
একটি দেশের সংস্কৃতি যদি বিশ্বের মানুষের কাছে আনন্দ ও বিনোদনের উৎস হয়ে ওঠে, তাহলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সেটি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে কে-পপ সেই সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
চীনের পক্ষেও স্টুডিও, প্রশিক্ষণ ও প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় করা সম্ভব। কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় হতে হলে শিল্পীদের কতটা স্বাধীনভাবে নিজেদের দর্শকের রুচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন।
টাইম-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, কে-পপের বৈশ্বিক সাফল্যের পেছনে শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি সহায়তা নয়; বরং ছোট অভ্যন্তরীণ বাজার, বিদেশি দর্শকের প্রতি মনোযোগ, আন্তর্জাতিক শিল্পীদের সঙ্গে সহযোগিতা, সামাজিক মাধ্যমের ব্যবহার এবং ভক্তদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরির সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, চীনের বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও তুলনামূলক বেশি সরকারি নিয়ন্ত্রণ সি-পপের আন্তর্জাতিক বিস্তারে ভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
টাইম ম্যাগাজিন অবলম্বনে





